কচি কলা পাতা পাড়, কালো বডি আর সবুজের উপর কালো সোনালি সুতার আঁচল, ভালোই মানিয়েছে শাড়িটা। লুকিয়ে লুকিয়ে শাড়ি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো নীলা, একটু এঁকে বেঁকে নিজেকে খানিক দেখে আবার জায়গা মতো শাড়ি রেখে চলে গেল রান্নাঘরে। বুটের ডাল রান্না হয়ে এসেছে, নামিয়ে এবার তাওয়া পেতে রুটি সেঁকতে হবে, বড় ভাবি’র জন্য সালাদ রেডি করতে হবে, বাবুর জন্য সুজি- অনেক কাজ পরে আছে। সকালে এই সময় টা বড্ড ব্যস্ত যায় নীলার, যৌথ পরিবারে সবার সকালের ব্রেকফাস্ট, সবাই ব্যস্ত, দুই ভাই যাবে অফিসে, রাফির স্কুল, বাবুকেও রেডি করে দিতে হয়। বাবু তো আর দশটা বাচ্চার মতো হলো না, সব সময় ওকে নিয়ে তাই এত চিন্তা।
বাবুর বাবা বাথরুম থেকে বের হয়েই ডাক দিচ্ছে, নীলা যে শাড়িতে হাত দিয়েছে, টের পায়নি তো? হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো নীলা, শফিক ব্যস্ত ভাবে আলমারি ঘাটছে। নীলা কে দেখেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, “আমার সবুজ টাই টা কোথায়?” নীলা একবারেই আলমারির ড্রয়ার থেকে বের করে আনল, সবুজের উপর কালো ছাপের টাই, দুই বছর আগে শফিকের জন্মদিনে এটা নীলা গিফট করেছিল। শফিকের কি আজকের দিনটা মনে আছে তাহলে?
“থ্যাংকস। আজ আমার কলিগ রীতার জন্মদিন, ওর প্রিয় রঙ সবুজ, তাই সবার আজ সবুজ পরার প্ল্যান। ওর জন্য একটা সবুজ শাড়িও কিনেছি, ১৫০০ পড়লো। দেখ তো শাড়িটা, ঠকলাম না তো?” একনাগাড়ে কথা গুলো বললো শফিক। কোনো দীর্ঘশ্বাস ছাড়াই খুব স্বাভাবিক ভাবে শাড়িটা নেড়েচেড়ে ভালো কথা বলে আবার দৌঁড়ালো নীলা, তবে এবার বাবুর ঘরে, বাবুর ওঠার সময় হয়ে গেছে। সময় ই নীলা কে এত শক্ত করেছে, নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে অটিজমে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়েই তার জীবন। চার বোনের সবচেয়ে আদরের নীলা, ভার্সিটি তে একজন ভালোবেসে নীলাঞ্জনা বলে ডাকতো, সেসব যেন গত জন্মের কথা। টিএসসিতে চায়ের কাপে আড্ডা বসানো নীলা, “প্রিয় প্রতিপক্ষ” বলে মাইক নিয়ে তুমুল বিতর্কে ব্যস্ত নীলা, কিংবা বইয়ের ভাজে রাখা শুকনো গোলাপ দেখে রাজ্যের চিন্তায় হারিয়ে যাওয়া নীলা, কারো সাথেই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না আর। বাবুর দিন শুরু হয় চড়–ইপাখির ডাকে, জানালার কার্ণিশের উপরে খুব সম্ভব বাসা বানিয়েছে, ভোর হতেই খুব চেঁচামেচি করে, বাবু ঘুম ভেঙে মনোযোগ দিয়ে শোনে, বাবা পাখি, মা পাখি, তাদের তিন ছানা, সবার গলার আওয়াজ আলাদা করতে পারে ও।
চোখ বন্ধ করে তাও শুয়ে থাকে, মায়ের ডাকে চোখ খুলেই আবার বন্ধ, ঘুমানোর ভান, দারুণ মজার খেলা। এরপর কোয়ালা ডিজাইনের ব্রাশ টা নিয়ে দাঁতের জার্মসের সাথে ঢিশুম ঢিশুম, আর আয়নার ভিতরে বসে থাকা বাবুর সাথে খেলা। এতক্ষণে মা আবার এসে স্কুলের জন্য রেডি করাতে নিয়ে যাবে। আয়নার বাবুটাকে তখন বড় হিংসা হয়, সকালে উঠেই স্কুলে যেতে হয় না, সারাদিন আয়নার ভিতরে খেলে।
বাবু রেডি হতে হতে সবার খাওয়া শেষ হয়ে যায়, বাবাও চলে যায়, যাবার সময় বাবু অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখে, কিছু হয়তো বলতে চায়, হয়তো না। ফাঁকা টেবিলে মায়ের সাথে বসে বাবু, মায়ের সামনে বসে চামচে করে সুজি খেতে হবে। এসময় মা সামনে থেকে উঠতে পারবে না। মাকে ছাড়া একটুও যেন চলা যায় না বাবুর। এরপর মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাবে বাবু, রাস্তা সব মুখস্ত হয়ে গেছে বাবুর, কোন দোকানে কোন চাচা কি বিক্রি করেন সব বলতে পারে। তাও যেন দেখা ফুরোয় না, ফুটপাত দিয়ে কয়েকটা কিন্ডারগার্টেন এ পড়া বাচ্চারা হেঁটে যায় ওদের পাশে, একজন ফেরিওয়ালা ভ্যান নিয়ে “সব্জি লাগবে গো, সব্জী?” বলে চিৎকার করছেন, রাস্তার ঐ পাশে একজন মুচি দাদু বসেন, দেখা মাত্র বলেন, “বাবু, চকলেট খাইয়ো না দাঁতে পোকা হবে” বলেন আর পান খেয়ে লাল হওয়া দাঁত গুলো বের করে হাসেন। সামনে কিছুদূর গিয়ে ভিক্ষুক দাদু, উনার দুই পা ই নষ্ট, এত মায়া লাগে বাবুর, মায়ের কাছ থেকে নিয়ে প্রতিদিন টাকা দেয় উনাকে। ফুটপাত টা ধরে পড়ে থাকে কত শুকনো পাতা, উপরে দাঁড়ালেই কেমন শব্দে ভেঙে যায়। বাবু এখন জানে শুকনো পাতার শব্দ হলো মর্মর, নুপুর এর শব্দ নিক্বণ, আর ঘোড়ার ডাক- ঘোড়ার ডাককে কি বলে মনে করতে করতে বাবু সামনে আগায়। আপন মনে বিড়বিড় করে সে, ঘোড়ার ডাক, ঘোড়ার ডাক, পথচলতি অনেকেই দেখে ওকে, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, কেউ কেউ খুব মায়া চোখে তাকায়, অনেকে আবার যেন তামাশা করে। খুব খারাপ লাগে বাবুর, ও বুঝতে পারে অন্যদের থেকে ও আলাদা, আলাদা হওয়া টা ঠিক হয় নি, এখন পৃথিবীর সব এক রকম মানুষ গুলো ওকে নিয়ে মজা করবে।
রাস্তার ঐ পাশে দেখা যাচ্ছে মোটর সাইকেল নিয়ে দুষ্টু ভাইয়ারা, মীরা আপুকে কি বিরক্ত টা করতো, কেউ সাহস করে কিছু বলতে আসতো না, মা ও না। খুব রাগ হতো বাবুর। মনে হতো ¯পাইডার ম্যান হয়ে আচ্ছামতো লড়াই করে। মীরা আপু আর এই পথে স্কুলে যায় না, আদৌ স্কুলে যায় কি না তাও জানে না বাবু। এবারে মীরা আপুর জন্য কষ্ট হয় বাবুর। ঘেউ ঘেউ শব্দে আবার খুশি হয়ে যায় বাবু, পাড়ার এই কুকুরটা চেনা। সামনে মতি মামার চায়ের টং, সেখানে ওর বয়সী বদি নামে এক ছেলে কাজ করে, দারুণ চটপটে, তবে স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের দেখলে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাবু অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে পারে না, নাহলে একদিন বদি কাছে জানতে চাইতো, “কি দেখ এভাবে?” একটু সামনে আগাতেই টিনের বেড়া দেওয়া বাড়ি থেকে হাম্বা হাম্বা শোনা যায়, না দেখেও শব্দ শুনে বাবু বোঝে, তিনটা গরু আছে ভিতরে, তিন রকম ডাক। স্কুলের গেটে এসে মা কে বলে, “মা, ঘোড়ার ডাক হল হেরেশা।” নীলা হেসে ঠিক করে দেয়, “বাবু, এটা কে হেরেশা বলে না, এটা হল হ্রেষা।”

আজ প্যারেন্টস ডে, সব বাচ্চারা কোনো না কোনো কিছু করে, বাবু গত দুই বছর ই কোরাস দলে ছিল, এবারো আছে, সবার সাথে গলা মিলিয়ে গাইছে, “মোরা ঝঞ্জার মতো উদ্যম”। তবে বাবুর কাছে তো আজকের দিনটা অনেক ¯েপশাল, ওর মায়ের জন্মদিন। বাবুর জন্মদিন এ তো মা কেক বানায়, কিন্তু বাবু কি করবে? অনুষ্ঠান শেষের আগে বাবু আবার উঠল স্টেজে, চিকন গলায় আবৃত্তি শুরু করলো, “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মা কে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।” রাঙা ঘোড়ায় টগবগিয়ে চলা বীরপুরুষ মাকে উদ্ধার করে আনলো হাতে লাঠি মাথায় ঝাঁকড়া চুলের ডাকাত দের হাত থেকে। আবৃত্তি শেষ এ প্রচুর তালির ভিড়ে বীরপুরুষ বাবু, খুঁজতে থাকে তার মা কে, যার জন্য এত আয়োজন। এমা! মা তো কাঁদছে। ইশ, মা কত্তো বোকা, আলতো করে মাথা চাপড়ায় বাবু। রাত দশটার পর বাড়ি ফেরে শফিক, এতক্ষণে বাবু ঘুমিয়ে যায়। প্রায় দিন ই দেখা হয় না, ঘুমন্ত ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় শুধু। রিসপেরিডন, রিসপারডেল, জিপ্রেক্সা- দামী সব ওষুধ লাগে বাবুর জন্য। সংসারের খরচ সামলে সঞ্চয় হচ্ছে না কোনো। অফিসে প্রমোশন টা অনেক দিন আটকে আছে। অনেক রকম চিন্তার বাণ বার বার বিদ্ধ করে।
শফিকের মনে ছিল আজ নীলার জন্মদিন, এটাও জানে যে ওর প্রিয় রঙ সবুজ। অনেক হিসেব নিকেশ করে টাকা বাঁচিয়ে তাই শাড়ি কেনা, কিন্তু কে জানতো, ড্রয়ারে রাখা শাড়িটা আগেই দেখে ফেলবে নীলা। বাথ রুমের দরজার ফাঁক দিয়ে এই সাড়ে সর্বনাশের কাহিনী দেখে রীতা নামের কল্পিত চরিত্রের আমদানি। খুব সুন্দর করে একটা চিঠি লিখে, শাড়ির ভাজে ঢুকিয়ে দিল শফিক। চিঠি তে সম্বোধন করা “নীলু” নামে, এটা শফিকের দেওয়া নাম। শাড়িটা দেখা মাত্র বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি শুরু করবে নীলা। বিয়ের পর হুমায়ূন আহমেদ এর নায়িকা দের মতো খুশি হলে ভেউ ভেউ করে কেঁদে দেওয়া স্বভাব দেখে ওর নাম দিয়েছিল “নীলু”। সেসব দিনের কথা ভাবতেই কেমন যেন চোখ ভিজে যায় শফিকের।

ফাহমিদা সুলতানা তিথি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঈশ্বরের কাছে সবসময় চাইতাম তিনি যেন আমায় মা দুর্গার মতন একটা কন্যা সন্তান দেন। অনেক সাধনা,অনেক মানতের পরে তিনি সত্যিই আমার প্রার্থনা শুনলেন। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ,আমার সবচেয়ে ভালোবাসার আধার আমার মেয়েকে আমার কাছে পাঠালেন। সেদিন ছিলো মা দুর্গার বোধন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্রসব বেদনার অসহনীয় যন্ত্রণার মাঝেও দূর থেকে কানে ভেসে আসছিলো ঢাকের ঢ্যাম কুড়াকুড় আওয়াজ। কিন্তু সব যাতনা ভুলে গিয়েছিলাম আমার মা দুর্গার মতন স্নিগ্ধা জ্যোতিসম্পন্ন ফুটফুটে রাজকন্যাকে দেখে। আর পাঁচটা বাচ্চার মতন ও পৃথিবীতে ভ‚মিষ্ঠ হয়েছিলো চোখের নোনাজলে নয় বরং মায়াভরা হাসি নিয়ে। ওর নামও রেখেছিলাম মা দুর্গারই নামে- কৌশিকী… কৌশিকী রায় চৌধুরী। অনন্তপুরের জমিদার বংশের নতুন সদস্য সে।তার স্বাগতও হয়েছিলো রাজনন্দিনীর মতনই। পুরো গ্রামে সেদিন মিষ্টির ছড়াছড়ি। আমার শ্বশুরমশাই বরাবরই বড্ড লোকজনের সাথে মেশা,তাদের সাথে সুখ-দুঃখ সমস্তরকম অনুভ‚তি ভাগ করে নেওয়া এগুলোতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আমার রাজকন্যার অন্নপ্রাশনেও তিনি কোন কমতি রাখেননি।ঢাকা থেকে রান্নার লোক আনানো হলো। চাঁদপুরের পদ্মার ইলিশ,কুমিলা থেকে রসমালাই… রাজশাহী থেকে রসালো আম আর বাকি ফলমূল… অন্যান্য দ্রব্যাদিও সবকিছুই তিনি নিজে তদবির করে এনেছিলেন।গ্রামের কোনো বাড়িতে সেদিন হাঁড়ি চড়েনি। সত্যিই সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্মেছিলো আমার কৌশিকী, আমার রাজনন্দিনী। যার এক ঝলক হাসিতেই মন গলতে বাধ্য। সারাদিন ছুটোছুটি, হুলোড় আর মুখে যেন কথার খৈ ফোটে… একেকটা কথার এমন জবাব দেবে যে না হেসে পারা যায়না। আর সারাদিনে হাজারখানেক প্রশ্নের বাণ-আচ্ছা, মা ঐ চাঁদটার বাড়ি কেন আমাদের গ্রামে হলোনা? আচ্ছা, ঐ নদীটা যে সারাদিন বয়ে চলে, ওর কি কখনো ক্লান্ত লাগেনা? আচ্ছা, ঐ যে দূরে পাহাড় দেখা যায়, পাহাড় তো কত্ত উঁচু হয়,আমিও কি এরকম বড় হবো একদিন, আমিও কি ওই পাহাড় ছোঁবো!ু রাস্তায় একটা প্রাণীর কিছু হলেও যার এক পৃথিবী মন খারাপ হয়, কারোর কোন কিছু হলে যে নিজে স্থির থাকতে পারেনা, ওইটুকু মেয়ে অথচ কত মায়া,কত মানবিকতাবোধ আর ঈশ্বরের কৃপায় মেধা, মনন আর পরিশীলতায়ও ও ছিলো সবার আগে। ওর বয়স যখন ছয়ে পড়লো, ওর বাবার ব্যবসার কাজের জন্য আমরা অনন্তপুর থেকে ঢাকায় চলে এলাম।
সেদিন ছিলো ০৫ জুলাই,২০১৯,শুক্রবার। কিছুদিন পরেই ছিলো আমার রাজকন্যার জন্মদিন। ছুটির দিন বলেই ওর বাবা কিছু কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলেন। ও আমার সাথে বাড়িতেই ছিলো। আমাকে বললো: ুমা,আমি একটু পাশের বাড়িতে যাই, একটু খেলেই চলে আসবো। এসে তোমার সব পড়া দিয়ে দিবো। আমিও ওদিকে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কেন যেন হঠাৎ হাতটা কেটে গেলে অসাবধনতাবশত বুঝলাম না। মনের মধ্যে খুঁতখুঁত করতে লাগলো। ভাবলাম অনেকক্ষণ কন্যার মুখদর্শন হয়নি বলেই হয়তো মনের মধ্যে এরকম অস্থির লাগছে, যাই, কন্যারতœকে ডেকে নিয়ে আসি। পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে খুঁজে না পেয়ে ভাবলাম যে নীচের মাঠে হয়তো গেছে খেলতে। কিন্তু না… পুরো বাড়ি,আশেপাশের বাড়ি, মাঠ… কোথাও আমার রাজকন্যাকে পেলাম না খুঁজে। ওর বাবাও তৎক্ষণাৎ পুলিশে ফোন করলেন। এক ঘণ্টা… দু’ঘণ্টা… তিনঘণ্টা… প্রায় বারোঘণ্টা পরে খবর এলো এলাকার শেষমাথায় ডোবার পাশের ঝোপে একটা বাচ্চা মেয়ের রক্তাক্ত অবস্থায় লাশ পাওয়া গেছে। লাশ সনাক্তকরণের জন্য আমাদের ডাকা হলো। পৃথিবীতে এর চেয়ে কঠিন মূহুর্ত বুঝি আর দ্বিতীয়টা হয়না! মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম: হে ঈশ্বর! এ যেন আমার রাজকন্যা না হয়ু। কিন্তু ঈশ্বর বুঝি এতই নির্দয় হয়েছিলেন আমার ওপর যে আমার রাজনন্দিনীকে আমার কাছে দিয়েও তিনি ফিরিয়ে নিলেন। আমার রাজনন্দিনীকে খুন করা হয়েছিলো… খুন… আমার চাঁদের কণার ওপর চার… চারজন নরপিশাচ হামলে পড়েছিলো। শুধু গণধর্ষণই নয় বেøড দিয়ে যৌনাঙ্গ কেটে দিয়েছিলো। একজন মা হিসেবে আমার ডায়েরীতে আমি যা লিখছি পৃথিবীর কোন মা-ই বোধহয় তার এই দুঃসহ পরিস্থিতির কথা স্বপ্নেও ভাবেননা। কাল অক্টেবরের ১৬ তারিখ। আমার রাজকন্যার সপ্তম জন্মবার্ষিকী। আর আমার রাজকন্যা… এখন পুরোনো খবরের কাগজের পাতার শিরোনাম। আমার রাজকন্যা, এখন আদালতে ঝুলে থাকা মামলার এজাহার। আমার রাজকন্যা, এখন সাদা পটভ‚মিতে কালো অক্ষরের খেলা। আমার রাজকন্যা, প্রতিদিন শত শত নরপিশাচের লালসার বলির মতই একটা নিঃশেষ ভোগ্যবস্তু। আমার রাজকন্যা, আমার দেয়ালে সেঁটে থাকা ছবি, আমার হ্যালুসিনেশন। যার ডাক তো আমি শুনি কিন্তু ছুঁতে পারিনা। যাকে অনুভব তো করি কিন্তু কাছে পেতে পারিনা। যাকে ভালো তো বাসি কিন্তু কোলে তুলে কপালে চুমু এঁকে দিতে পারিনা। যাকে জড়িয়ে ধরে আমার সমস্ত ক্লান্তি ভুলতে পারিনা। যে ঘুমের মধ্যেও মা… মা… বলে চমকে উঠেনা আর। আর বায়না ধরেনা যে, মায়ের হাতে ছাড়া কিছুতেই খাবেনা, যাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য আমাকে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবেনা, যে কখনোই বলবে না, মা, কেন অন্য বন্ধুদের মতো আমারো একটা দিদিভাই নেই… তার আর কোনদিন কোনো আবদার পূরণের প্রয়োজন পড়বেনা… কেননা, আমার রাজকন্যা এখন আর বোধনের আগমনী গান নয় বরং পূর্ণ আদ্যাশক্তি হয়ে প্রস্ফ‚টিত হবার পূর্বেই বিসর্জনের বিদায়ী সুর। আমার রাজকন্যা এখন জীবন্ত অতীত!

ঋতু কর্মকার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

হাতিয়ার একটি দরিদ্র পীড়িত পরিবারে জন্মেছিল রিমু। তার বাবা ছোটখাটো একটা ব্যবসা করত। কিন্তু, সেখান থেকে বৃদ্ধ বাবা-মা, ছোট বোন আর তিন সদস্যের ব্যয়ভার বহন করা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় পুরো পরিবারের ভরনপোষণসহ সবকিছু রিমুর বাবার উপর প্রকৃতিগতভাবে পড়েছিল। এদিকে তার ছোটবোন সেইবার ষোলোতে পা দিয়েছে। তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সবমিলিয়ে চিন্তার সমুদ্রে মালেক মিয়ার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা দিনদিন ভেঙে পড়ছিল। একদিন হঠাৎ মালেক মিয়ার বাড়িতে তার ফুপাতো ভাই বেড়াতে এলো। সে কাতার প্রবাসী। মাসদুয়েক আগে সে দেশে ফিরেছে। বিয়েও করেছে দুই সপ্তাহ আগে। ফুপাতো ভাইকে দেখেই মালেক মিয়া হতচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
-কি খবর ভাইসাব? একা কেন? নতুন বউ, এখন না নিয়ে এলে কখন? তাছাড়া, ক’দিন পরে তো আবার চলে যাবে।
-এইতো, একা একা চলে এলাম। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। বউকে নিয়ে অত আদিক্ষেতার বয়স কী আমাদের আর আছে?
সবাই একগাল হেসে দেয়।
পরদিন বিকেলে একসাথে সবাই গল্প করছে। ফুপাতো ভাই মিজান কথায় কথায় বলে ওঠে যার মাধ্যমে আমি কাতারে গিয়েছি, সে আবার নতুন করে লোক নিচ্ছে। বেশ ভালো লোক। অন্যসব দালালদের মত না।
রিমুর দাদির চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। হঠাৎ বলে ওঠে, খরচ কেমন বাপ?
-এই ধরুন লাখ তিনেক।
-আমার মালেকের তো তেমন আয় রোজগার নাই। ওর জন্য কিছু করতে পারবি না?
-টাকা দিতে পারলে সব হবে। আমার অনেক কাছের লোক। এই কাজটা আগে হবে।
রিমুর মায়ের বুকটা অজানা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।
রাতে বাড়ির আঙিনায় চ‚ড়ান্ত আলোচনা করছে।
মালেক মিয়ার কপালে ভাজ। ইতস্তভাবে বলে,
-তিনলক্ষ টাকা তো অনেক। ক্যাশটাকা অল্প আছে। মনে হয় সম্ভব হবে না।
মালেক মিয়ার বাবা বলে ওঠে,
-জমি বসতি বাদ দিয়ে মোট দুই বিঘা।একবিঘা না হয় বিক্রি করে দিলাম।
মালেক মিয়ার জবাব, তাতেও হবে না।
মার পরামর্শ, একজোড়া চাষের বলদ আছে, ওটা বিক্রি কর। ছাগল দুইটা থাকুক। তাতেও নাহলে আমার নাকফুল আর কানের দুল দুটো বিক্রি কর।
এবার মিলে গেছে। কথা পাকাপোক্ত। মিজান দালালের সাথে কথা বলবে। পরবর্তীতে মালেক মিয়া কথা দেন যে একমাসের মধ্যেই পুরো টাকা দেবেন।
যেই কথা সেই কাজ। মিজান ওদিকে আলোচনা প্রকৃতই করছে। এদিকে রিমুর মায়ের ঘোর আপত্তি। বিদেশের ব্যাপার, কি হয় না হয়।সে কোনমতেই যেতে দেবে না। তিনবছর বয়সী রিমু কিছু বোঝে না। মাঝে মাঝে দুয়েকটা নিজের মনমত কথা বলে আর বাবা-মা কি বলে তা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর শোনে।
মালেক মিয়ার ও কিছুটা কলিজায় টান পড়ে। তবুও পুরুষের ধৈর্য আর সংযম পাথর ভাঙা। রিমুর মাকে সে বোঝায়। এই খড়ের ঘরে থাকতে হবে না। সন্তানদের কষ্ট হবে না। আমাদের ও ভাল একটা বাড়ি হবে। সবাই দুধে ভাতে থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
রিমুর মায়ের চোখে জল। জোর দিয়ে বলে ওঠে,
-সবাই তো দুধেভাতে থাকবে। আর আমার কি হবে?
তার এই অসহায়ত্বে রাতের ল²ীপেঁচাটাও যেন করুন সুরে কেঁদে ওঠে।
মালেক মিয়া নি®প্রভ হয়ে যান।তার মুখ থেকে তৎক্ষণাৎ সব কথাই যেন হারিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে আবার বোঝানোর চেষ্টা করেন। এভাবে দিনরাত মালেক মিয়া বোঝাতে থাকেন। ধীরে ধীরে রিমুর মায়ের মন গলতে থাকে। আবেগের সূর্যটা ক্রমেই স্তিমিত হয়ে যায়। সে ও বা¯তব পৃথিবীকে কল্পনা করতে থাকে। পরে সে পুরোপুরি রাজি হয়ে যায়।
একদিন একটা খবর আসে। মিজান তার পাসপোর্ট- ভিসা সবকিছুর ব্যাবস্থা করে। তখন মে মাস। জুনের শেষদিকে মালেক মিয়ার কাতারের ফ্লাইট। মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে থাকে। কিছুদিন ধরে রিমুর দাদা তার বাবার দোকানে বসে। হিসাবগুলো ধীরে ধীরে বুঝে নেন। মালেকের ভালো কিছু না হওয়া অবধি ব্যাবসা তাকেই সামলাতে হবে। এদিকে সময় ঘনিয়ে এলো।
আগস্টের ৬ তারিখে রিমুর বয়স চার বছর হবে। জুনের ২২ তারিখে মালেক মিয়া প্রস্তুত হলেন। আরেক ফুপাতো ভাই তাকে বিমানবন্দরে নিয়ে যাবে। রিমুর মায়ের বুকের ওপর দিয়ে যেন সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে। পুরো পৃথিবীকে আজ তার নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। দারুণ মিষ্টি ভাষা গুলোও তার কানে তেতো হয়ে ঢুকছে। বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে আর রিমুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠছে। মালেক মিয়া সহ সবাই সান্ত¡না দেন এই বলে যে মোবাইলে তোমাদের খোজ খবর তো নেবই। শেষবারের মত বাবার কোলে ওঠে রিমু। এখন সে সবকিছু মোটামুটি বোঝে। বাবার কোল থেকে সে আজ আর নামবে না। চিৎকার দিয়ে কান্না করে ওঠে আর বলে, বাবা কোথায় যাচ্ছে, বাবার সাথে আমিও যাব। জোর করে প্রতিবেশীরা নামিয়ে সান্ত¡না দিতে থাকেন। মালেক মিয়া চুপিচুপি পেছনে ফিরে একবার চোখমুছে ফেলেন। পুরুষের বুকের খাঁচাটা এমনি ই¯পাত কঠিন। বেঁকে যাবে তবু ভাঙবে না। সবার কাছে বিদায় নিয়ে রওয়ানা দেন মালেক মিয়া।
ছয় বছর পর একটা ছুটিতে আসেন মালেক মিয়া। এতদিনে তার বাড়িঘর রাজকীয় হয়েছে। পরিবারের সবার পোশাকে- খাবারে পরিবর্তন এসেছে। রিমু একটা কিন্ডারগার্টেনে যায়। সকাল বেলা খিচুড়ি আর সেমাই না পেলে রিমু স্কুলে যায়না। পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা সব মিলিয়ে গেছে। গত বছর তার ছোট বোনের ভাল একটা পরিবারে বিয়ে হয়েছে। আফসোস তিনি আসতে পারেন নি। তবুও, বাড়িতে ফিরে সব এলাহি পরিবেশ দেখে নিজেকে স্বার্থক মনে করছেন। তিনমাস পর আবার কাতারে রওনা দেন।
পরের বছর, রিমুর একটা ছোট ভাই পৃথিবীতে আসে। এখন রিমুরা বাবার সাথে ইমোতে কথা বলে। প্রতিদিন কমপক্ষে আধাঘন্টা কথা হয় পরিবারের সাথে। ২০১২ সালের ফেব্রæয়ারিতে রিমুর দাদা মারা যান। মোবাইলের ওপারে অশ্রু নিপাত ছাড়া আর কিছু করার নেই মালেক মিয়ার। দশ-বারোদিন পরে ছুটি নিয়ে দেশে ফেরেন। এসে বাবার কবর জিয়ারত করে মিলাদের ব্যবস্থা করেন।
রিমু সেইবার এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তার বাবার দুইমাসের ছুটি। মালেক মিয়ার এবার সংকল্প, বাবার মৃত মুখটা দেখতে পাননি, বোনের বিয়েতে থাকতে পারেন নি। নিজের একমাত্র মেয়ের বিয়েটা দেখে এবং নিজের হাতে স¤পন্ন করবেন।
ইদানিং একবছর সিনিয়র এক কলেজমেটের সাথে রিমুর ভাব। শাসন এবং ভয়হীনতা তাকে এতদুর নিয়ে গেছে। সে পরিবারের পছন্দে বিয়েতে নারাজ। কিন্তু, প্রেমিক নিজের পায়ে দাড়াতে অক্ষম বলে পালিয়ে বিয়ে করছে না। সুতরাং, প্রেমকে কবর দিয়েই বিয়ের পিড়িতে বসে রিমু। যদিও, অনেক কষ্ট, অনেক আবেগ তবু সে আজ অসহায়।
পাত্র পছন্দ। পাত্র আরব আমিরাত প্রবাসী। রিমুর মায়ের প্রবল আপত্তি সত্তে¡ও তার সাথেই বিয়ে হবে। রিমুর মা প্রবাসীর সাথে বিয়ে দিতে নারাজ। তবুও, নারীর মত মূল্যহীন। ধুমধাম করে বিয়ে হল।
কিছুদিন পরে রিমুর বাবা কাতার চলে যান। আর, ছয়মাস পর তার স্বামীও আরব আমিরাত চলে যায়।
রিমুর মাথা থেকে ছাতাটা সরে গেল। প্রতিটা দিন কত ঝড় আর প্রতিটা রাতে কত বৃষ্টি! সব রিমুর গায়ের উপর দিয়ে যায়। বিজলির ঝলকানি আর ঝড়ের ঝাপটায় সে দিনদিন ভীত হতে থাকে। ক্রমেই বর্ষা তার কাছ থেকে বিদায় নেয়। সে আর কাঁদে না। তার বৃষ্টিভেজা রাতগুলো ফুরিয়েছে। এখন থেমে থেমে বর্ষণ এলে সে অন্যের ছাতায় লুকোতে শিখেছে। লোকলজ্জা তার এই আশ্রয়ের কাছে কিছুই নয়। সে বাঁচতে চায়, লজ্জ্বার চাদরটা গা থেকে নেমে গেলেও, যৌবনের এই সাইক্লোন আর টাইফুন তার গা থেকে লজ্জার চাদরটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
.
পরের বছর রিমুর কোলে ফুটফুটে একটা ছেলে আসে। নাম রাখে রুম্মান। তার স্বামী ছেলের খোঁজ নিতে কখনো ভোলে না। সে ও ইমোতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়।
.
ইদানিং, রিমুর সাথে তার চেয়ে কমবয়সী দেবর রিফাতের বেশ ভাব। তার শাশুড়ি প্রথমে বুঝতে পারেন। তবু, বউমাকে কিছু বলতে পারেন না। আড়ালে ছেলেকে শাসন করেন। পরে আবার একই অবস্থা। একদিন লজ্জ্বাজনক ঘনিষ্ঠ অবস্থায় তার শাশুড়ী দুজনকে দেখে ফেলেন। রিমুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারলেন না। কারণ, নিজের ছেলেও জড়িত। তার ছেলের চরিত্র নিয়ে কেউ কথা বলুক তা তিনি চান না। তবু,এই রাগে রিমুর সাথে তার শাশুড়ি খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। কথায় কথায় খোঁটা দেন। আড়ালে রিমুর শ্বশুর তার দেবরকে সাধ্যমত শাসন করেছেন। একদিন পাশের বাড়ির গ্যাদার মা অন্তরঙ্গ অবস্থায় দুজনকে দেখে ফেলে। এবার এপাড়া ওপাড়া সব জেনে গেল। রিমুর কাছ থেকে সন্তান কেঁড়ে নিয়ে তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। প্রথমদিকেই রিমুর মাকে ফোন করে তার শাশুড়ি সাবধান করেছিলেন। কিন্ত, রিমুর মা রিমুকে একটা গালি দিয়েও শাসন করে নি। শুধু চুপচাপ শুনে হু হ্যাঁ উত্তর করেছে।
.
বিচার বসল। বিচারে রিমুকে জোর দিয়ে কোন বিচারক কিছু বলতে পারলেন না। কারণ, আরেকজন অপরাধী তার স্বামীর ছোটভাই। ফোনে তার স্বামীর কাছে মাফ চেয়ে, শশুর আর শাশুড়ির পা ধরে এমন লজ্জিত কাজ আর কখনো না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবার বেঁচে যায় রিমু। আবার সংসার শুরু করে।
.
ইদানিং, সে তার দেবরের সাথে খুব বেশি মেশে না। তবুও, দেবরের প্রেমের খোঁজ নিতে সে ভোলে না। কয়েকদিন আগে ভুল নাম্বারে এক মহিলার সাথে তার দেবর রিফাতের কথা হয়। কেউ কাউকে দেখে নি। পরে ইমোতে কথা বলা শুরু হয়েছে। রিমু তার দেবর কে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে। একদিন রিফাত বলে বসে, ঐ মহিলাকে সে বিয়ে করবে। রিমু তাকে টাকাসহ সবকিছু জোগাড় করে দেয়। গোপনে সেদিনই তারা কোর্টে যায়। রিফাত ইমো ছাড়া সরাসরি এর আগে তার হবু বউকে কখনো দেখে নি। বাসা থেকে মাঝে মাঝে রিমু বিয়ের খোঁজ নিচ্ছে। রিফাত যদিও এর আগে দেখে নি তবু কেন জানি হবু বউকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। হবু বউও ভ্যাবাচ্যাকার মত মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। কিন্তু,এই চেনা চেনা মনে হওয়ার ব্যাপারটা নিছক দুজনের খেয়াল মনে হল। হবু বউ পিতা-মাতা আর স্বাক্ষী নকল ভাড়া করে নিয়ে এসেছিল। রিফাত তা জানত না। ঠিকানাও নকল। বিয়ের পর সরাসরি বাসায় নিয়ে এল রিফাত। আজ তার কাছে সব লজ্জা আর ভয় ¤¬ান। হবু বউ আধাঘন্টা আগে থেকে ঘোমটার ভেতরে চোখ বন্ধ করে আছে। বাসায় ঢোকার পরও চোখ খোলে নি। আগ্রহ নিয়ে প্রতিবেশীদেরকে বউ দেখাতে নিয়ে আসে রিমু। ওদিকে রিমুর শাশুড়ি ব্যাপক গালিগালাজ করছে। এবার প্রথমে রিমু দেখার জন্য ঘোমটাটা ওঠালো। ঘোমটা তুলে যা দেখলো,তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না রিমু। সে স্ট্রোক করে মাটিতে পড়ে গেল। কয়েকমিনিটের মধ্যেই সে মারা গেল। কারণ, ঘরে বউ হিসেবে তার দেবর যাকে নিয়ে এসেছে সে রিমুর গর্ভধারিণী মা।
নামঃ আব্দুর রহিম বাদশা
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিবিদ্যালয়

পারুলা হুড়মুড় করে উঠে বসল বিছানায়। কালকে রোজা শেষ হয়েছে।আজ খুশীর ঈদ।পারুলার অবশ্য তেমন কোন মাথাব্যথা নেই এমন উপবাস বা আএকটি ঈদ ও অন্তহীন অপেক্ষা

পারুলা হুড়মুড় করে উঠে বসল বিছানায়। কালকে রোজা শেষ হয়েছে।আজ খুশীর ঈদ।পারুলার অবশ্য তেমন কোন মাথাব্যথা নেই এমন উপবাস বা আধা রোজা ওকে প্রায়ই করতে হয়। লোকের বাড়ি কাজ করে খায় ও আদরী আর রুসতুম দুই ছোট্ট ছেলেমেয়েকে খাইয়ে নিজের জন্য অনেক সময়ই কিছু থাকে না ওর তার স্বামী রহমান সেই গতবছর থেকে নিখোঁজ ইলিশের সময় ছিল সব জেলে মাঝি ফিরে এলো, কিন্তু এলো না কেবল রহমান পারুলার বুকের ভিতরটা সেই আগের খুশীর দিনগুলি,খুশীর ঈদের কথা ভেবেই হু-হু করে যন্ত্রণায় আজ বাবুর বাড়িতে কতো আনন্দ সবাই নতুন পোশাকে সাজবে। আর কতরকম সুস্বাদু খাবার, মিষ্টি কত কী ওকেও একটা শাড়ি দিয়েছে ওরা। আর সে নুরু ভাইজান এর দোকান থেকে ধার করে ছেলেমেয়ে দুটোর জামা এনেছে পারুলার দুই চোখ জলে ভরে উঠলো ও ভাবে আল্লাহ কোথায় আছেন ? ও তো রোজ পবিত্র আতœায় মনপ্রাণ ঢেলে নমাজ পড়ে, তসবিহ গোণে, কই তাঁর কানে কী ওর প্রার্থনা পৌঁছায় না? আবার ইলিশের মৌসুম এসে গেল রহমান এর জন্য অন্তহীন অপেক্ষা ওর ও স্বপ্ন দেখে, রহমান ফিরে এসে বলছে, কই গো আদরীর মা? কোথায় গেলা? আজ একখান বেশ বড় ওজনের ইলিশ পাইছি। বাজারে বেশ দর উঠব -দেইখো- পারুলা দুই ছেলেমেয়েকে গোসল করিয়ে আজ সালমার বাড়িতে রেখে কাজে গেল ও ওদের বলে গেল সন্ধ্যায় ওদের জন্য অনেক বরফি, মিষ্টি নিয়ে আসবে ছোট্ট আদরী আর রুসতুম এর খুশী আর ধরে না আজ। সারাদিন ছেলেমেয়ে দুটোর জন্যে ছটফট করে গোধুলির রাঙা আলোয় বাড়ির পথ ধরল পারুলা।
আজ ছেলেমেয়ে দুটোকে পেট পুরে ভালমন্দ খাওয়াবে সে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন ওর কুঁড়ে ঘরের সামনে এসে গেছে ও কিন্তু ওর ঘরের সামনে আবু চাচা , ফতিমার মা আরও সবাই ভিড় করেছে কেন? ওরা কাঁদছে কেন? ওকে দেখামাত্র চুপই বা হয়ে গেল কেন? ভিড় ঠেলে ঘরে ঢোকে ও আদরী ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে থাকে পারুলা কেমন যেনো কিছুই না বুঝে বলে,কী হয়েছে মা -কাঁন্দস ক্যান, রুসতুম কোথায়? এত্ত মাইনসে কী করতাসে? কার কী হইসে ? তোদের জন্য মিঠাই আনসি, আই মা। রুসতুম কই-ও খোকা —
আদরী মাকে জড়িয়ে কেঁদে বলল শুধু -কারে ডাকো মা? ভাইজান বায়না কইরা রহিম চাচার লগে নদীতে গেছিল ওরে পাড়ে রাইখা চাচা জাল ফেলতেছিল নদীতে একসময় একখান হঠাৎ জলের তোড় আসে।কোনরকমে স্রোত সামলায়ে চাচা ঘুইরা দেখে ভাইজান পাড়ে নাই বহু খুঁজ্যাও ওকে পাইনাই মা—
হঠাৎ সব শূন্য হল আজ খুশীর ঈদে।এক নেহাতই অখ্যাত গাঁয়ের হতদরিদ্র মায়ের ঘরে।শুধু একটা চিৎকার মাতৃহৃদয়ের হাহাকার ছিঁড়ে কাঁপিয়ে দিল ঈদের আকাশ বাতাস… খোঁকা রে…
সব খাবার পারুলার অচেতন শরীরের হাত থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল মাটির ঘরে ।
আল্লাহর কাছে ইনসাফ -এর প্রার্থনায় খুশীর ঈদে পারুলার পাওনা হল আর একটা নতুন অন্তহীন অপেক্ষা।


সাদিয়া আফরিন প্রমা
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

১.
কাসেম মিয়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে সামনে বসা পকেটমারের দিকে তাকিয়ে আছে। এ নিয়ে ৯ বার এই বেটাকে ধরা হলো। পকেটমারের নাম রফিক।বাপের নাম কলম আলী। বাড়ি বড় বাজারের পিছনে। এবার চুরি করেছে ২৫ টাকা, আর একটা ফাটা মানিব্যাগ। গণধোলাই দিয়ে জনতা থানায় দিয়ে গেছে। কাসেম পকেটমারের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করছে বাড়ির পিছনের ৫ শতাংশ জমির কথা।জমির কাগজ নিজের নামে করতে হবে। কিন্তু কেরানি মশায় নাকি ফাইল খুজে পাচ্ছেনা।কাশেম মিয়া ঠিক ই জানে নগদ কিছু দিলে ফাইল পাওয়া যাবে। কিন্তু ঘুষ যে কোনো কালেই নেয়নি,সে ঘুষ দেবে কেন?
বড় স্যারকে দিয়ে একটা ফোন করাতে হবে। তাহলেই কাজ আপনা থেকে হয়ে যাবে। কিন্তু এজন্য বড় স্যারের ফুটফরমাস খাটা লাগে। ব্যাপারটা ভালো না লাগলেও কি আর করা যাবে। কনস্টেবল জামান এর কথায় কাসেমের হুশ হয়।
– স্যার লক আপে ঢুকাই।
কাসেম মিয়া চায়ে আবার চুমুক দিল।
– দেখছস কি মাইর দিছে।২৫ টাকার জন্য এনাফ শাস্তি পাইছে। ওই ব্যাটা, বাড়ি যা।
রফিক ফাটা কপাল চেপে ধরে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
– স্যার, এরে ছেড়ে দিলেন? কাল তো আবার চুরি করবে।
– জামান শোন,২৫ টাকা চুরি হয় না। ওটা খোয়া যায়।সব কেইস এত সিরিয়াস ভাবে নিবা না।
– কেন স্যার?
– লক আপে এত জায়গা হবে না। (হা হা হা)।
নিজের কৌতুক এ নিজেই হাসতে শুরু করলো কাসেম মিয়া। তাকিয়ে দেখে জামান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।হাসি থামিয়ে জামান কে জিজ্ঞেস করল- চাকরি কয় বছর হল তোমার?
– স্যার আমি নতুন। এক মাসের মত।
– সিনিয়র হিসেবে একটা টিপস দেই শোন, বড় অফিসার হাসলে তুমিও হাসবা। ওকে?
-জ্বী স্যার। কিন্তু কেন স্যার?
প্রশ্নটা শুনে কাশেম মিয়ার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তবুও যতটা সম্ভব ঠান্ডা গলায় বলে – আর একটা টিপস দেই, আহাম্মকের মত সব কথায় প্রশ্ন করবা না। যাও আমার জন্যে চা আনো আরেক কাপ।
-জ্বী স্যার।
জামান চা আনতে গেল। কাসেম মিয়া তার টেবিলটা একটু টেনে ঠিক জায়গায় বসালো।এরপর আয়েশ করে বসে পেপার টা পড়া শুরু করল।এমন সময় খুব মৃদু আওয়াজ তুলে সরকারি টেলিফোন বেজে উঠল। কাসেম মিয়া ফোন কখনো প্রথম বারে ধরে না। না হলে লোকে ভাববে থানার এএসআই এর কোনো কাজ নেই। রিং কেটে যাওয়ার ঠিক আগে সে ফোনটা রিসিভ করলো।
– হ্যালো, রসুলপুর থানা?
-ভাই তাড়াতাড়ি আসেন, ডাকাতি হচ্ছে।
বেশ জটিল কথা।এই গ্রামীণ এলাকায় সবাই মোটামুটি গরীব।ড াকাত কোথা থেকে আসবে । আজ ৬ বছর হলো এই এলাকায় আছেন কাসেম মিয়া। সর্বোচ্চ বউ পেটানোর মামলা হয়েছে। আজকে একদম ডাকাতি? নাহ দিনকাল আসলেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
-ভাই ভয় পাবেন না । কোথায় ডাকাতি হচ্ছে?
-ভ‚মি অফিসে। পিস্তল ধরে একজন লোক ভিতরে সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে।
এইবার ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকছে না কাসেম মিয়ার। ভ‚মি অফিসে ডাকাত কি ডাকাতি করবে? পুরোনো ফাইল? নাকি উল্টা পাল্টা শুনতে পাচ্ছে ।
তাই সে আবার জিজ্ঞেস করে- আর ইউ শিওর?
– আরে ভাই শিওর। তারাতাড়ি আসেন।
গোলমেলে ব্যাপারটা। মাথায় টুপি পড়ে, গাড়ির চাবিটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে সে ডাক দিল -জামান, তাড়াতাড়ি চল।ডাকাত পড়ছে। মজনু আর কাদের কেও নিয়ে আয়।
– জ্বী স্যার । কিন্তু স্যার এই চা কি করব?
– হাঁদারাম আগে চল। পরে তোর চা দেখব।

২.
ভ‚মি অফিস ঘেরাও দিয়ে ডাকাত গ্রেফতার করে ফেলল কাসেম। ডাকাত টা মনে হয় নতুন এই লাইনে। স্যারেন্ডার করতে বলা মাত্রই স্যারেন্ডার করে ফেলল। দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই অজপাড়া গাঁয়ে মিডিয়া এখনো এসে পৌঁছায়নি।কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বলে কথা। ওসি স্যার ঢাকা থেকে আসবেন আগামী পরশু। ততদিন পর্যন্ত লক আপে রাখতে হবে। হিরো হওয়ার সুযোগ পেয়ে কাসেম মিয়ার ব্যাপক ভালো লাগছে। ডাকাত টাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে বসলো সে।
-নাম?
-শান্ত মাহমুদ।
-বয়স?
-২৭ বছর।
-থাকোস কোথায়?
-শরীফাবাদ।
-এটা তো পাশের থানায় পড়ছে।এই থানায় ডাকাতি করতে আসছোস কেন?
-জ্বী, দুই থানারই ভ‚মি অফিস একটা তো তাই।
-তা জনাবের কি বাজারের ব্যাংক, দোকানপাট নজরে পড়ে নাই? ভ‚মি অফিস ডাকাতি করতে আসছ? (হা হা হা) (হা হা হা)।
নিজের হাসির আওয়াজ এর সাথে এবার জামানেরও হাসির আওয়াজ শোনা গেল।যাক ছোকড়াটা কিছু শিখতেছে।
-জ্বী স্যার।
-তা কি ডাকাতি করলা?
মিটি মিটি হাসতে হাসতে বললো জামান।
-জ্বী আমার জমির কাগজপত্র নাকি হারায় গেছিল। অনেক ঘুরেছি। কেউ দেয়না।৫ লাখ টাকা ঘুষ চাইছিল। কিন্তু আমার কাছে এত টাকা নাই।জমিটা বেঁচে টাকা জোগাড় করা দরকার। তাই ডাকাতি করতে গেছি।আমার জমির কাগজপত্র অবশ্য পেয়ে
গেছি। এখন আর সমস্যা নেই। আমাকে যা খুশি করেন।
কাসেম আলীর অবাক লাগে। এইরকম কাহিনী আগে কেউ বানায় নাই।এটা নতুন পাগল মনে হচ্ছে।
– অস্ত্র কোথায় পেয়েছিস?
-ওটা আমার না।আমার ভাইপোর খেলনা।একদম আসলের মত, তাই না স্যার।
কাসেম পরীক্ষা করে দেখে, কথা সত্য। খেলনা বন্দুক।
– তা ভাই আপনার টাকা দরকার কেন?
– মা অসুস্থ। হাসপাতাল এ ভর্তি করতে হবে।
– ও, তা ভাই এই বুদ্ধি আপনাকে কে দিল?
– ভাবলাম, যেহেতু ঘুষ দিলে হারানো ফাইল ফিরে পাওয়া যাবে, তাহলে ফাইল ভেতরে আছে।আর সোজা ভাবে যেহেতু এরা দেবে না,তাই একটু অন্য রকম ভাবে চেষ্টা করলাম।
কাসেম মিয়ার বেশ মজা লাগল।বাহ বাঙালির বুদ্ধি বেড়েছে। কাসেম মিয়া বলল জামান একটু বাইরে দাঁড়াও।
-জ্বী স্যার।
জামান বাইরে গেলে কাসেম মিয়া শান্ত সাহেবের দিকে নজর দিলেন।
– (নিচু গলায়) দেখুন আপনার নামে ডাকাতি মামলা হবে। অস্ত্র আইনে মামলা হবে। যাবজ্জীবন কোনো ম্যাটার না। সবই আমি বাতিল করে দেব যদি আপনি আর একবার ডাকাতি করেন।এবং এখন ই।এক ই জায়গায়।
– আপনি শিওর? (বিস্মিত শান্ত মাহমুদ)
-(হা হা হা) করে উচ্চ স্বরে হেসে উঠলেন কাসেম মিয়া।
দরজার বাইরে থেকে কনস্টেবল জামান ও হেসে উঠল। সিনিয়র স্যার হাসলে যে হাসতে হবে।
চৌধুরী রেহমান নাফিস
মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি

এক.
মেয়েটিকে আমি যখন তৃতীয়দিনের মতো সেই পাকা পিলারটার উপর বসে থাকতে দেখেছিলাম , সেদিন তার চোখে কোন অশ্রু ছিল না । কিন্তু আকাশের সবটুকু মেঘ যেন ভর করেছিল তার দু’চোখে। শীতের শান্ত, স্নিগ্ধ বিকেল হঠাৎ করেই ঠিক কালবোশেখীর আগের সময়টার মতোই অশান্ত হয়ে উঠেছিল। বাতাসে উড়া ধুলো মাড়িয়ে এলোচুলে ঠাঁয় বসেছিল সে। প্রকৃতির অকস্মাৎ বিদ্রোহের প্রতি যেনো বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। কিন্তু আমি তাকে দেখছিলাম দেয়ালের আড়াল থেকে, তৃতীয়দিনের মতো। সাদা সালোয়ার কামিজ পড়া, গলায় কালো ওড়না জড়ানো এই মেয়েটাকে আমার কাছে একটুকরো সাদা মেঘ মনে হচ্ছিল। প্রকৃতির বিদ্রোহের অন্ধকারাচ্ছন্ন অশান্ত বিকেলে অনেকগুলো ঘুটঘুটে কালো মেঘের সÍূপের মাঝে আনমনে বসে থাকা একটুকরো যেন সাদা মেঘ। তাই মেয়েটির নাম দিচ্ছি মেঘপরী।
মেঘপরীর জন্য সেদিন প্রথম আমার ভেতরে হাহাকার উঠেছিল। “কবিমন” নামক স্বার্থান্বেষী মনটাকে মাটি চাপা দিয়ে মেঘপরীর জন্য প্রকৃতির মতো আমার মনেও হাহাকারের বিদগ্ধ হাওয়া বয়ে গিয়েছিল। হৃদয়ে অসহ্য চিনচিনে ব্যাথায় ছটফট করে উঠেছিলাম আমি। অথচ এই আমিই যেদিন মেঘপরীকে প্রথম ওই পিলারটার উপর বসে থাকতে দেখেছিলাম; সেদিন তার চোখে জল ছিল, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল সে। অঝোরে ঝরতে থাকা অশ্রু লুকানোর বা রুমালে শুষে নেয়ার কোনো আয়োজন ছিল না তার। সে কাঁদছিল,কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে। আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলাম। তার কান্নার উৎস, বেদনার অতল আমার জানতে ইচ্ছে করেনি। কিংবা লুকিয়ে একজনের যন্ত্রণার প্রকাশ দেখতে আমার অস্বস্তি লাগেনি, অন্যায় মনে হয়নি। আমি বরং উন্মত্ত ছিলাম এক সদ্য যৌবনে অধিষ্ট রমণীর বেদনায় লীন হয়ে যাওয়া অন্তরাত্মার কাঁপনটুকুর বহিঃপ্রকাশ কেমন হয় তা এক কবির চোখে দেখার জন্য ; কবিআত্মায় অনুভবের জন্য ।
নারী আর প্রকৃতি; দু’টোই কোনো কবির কাছে চির আরাধ, রহস্যর আঁধার । সদ্যযৌবনা রমণীর কান্নামিশ্রিত মুখ দেখে আমার ‘কবিমন’ সেদিন তাই অশান্ত, অবাধ্য স্বার্থপর অমানুষ হয়ে উঠেছিল। তাই কান্নায় ভেঙে পড়া মেঘপরীর ফুলে উঠা চোখের পেছনের যন্ত্রণার পাহাড়কে সে দেখেনি, সে সেটাকে দেখেছে বসন্ত শুরুর প্রায় মরা গাছের পাতার রঙিন পুনর্জন্মের রঙে। কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠা মেঘপরীর অশ্রুধারাকে সে মিলিয়েছে অশান্ত প্রকৃতির বৃষ্টিক্রন্দনের সাথে। মেঘপরীর মুখায়বের যন্ত্রণাদায়ক নীলরঙকে সে অনুভব করেনি, জেনেছে বিষণœ প্রকৃতির মৌনতারূপে।
দ্বিতীয় দিনেও আমি তাই করেছি। নীরবে আড়ালে থেকে শেষ বিকেলের আলোয় হাসপাতাল বিল্ডিঙের পেছনের প্রায় জনশূন্য হাঁটাপথের পাশে বসে কাঁদতে থাকা এক রমণীর অশ্রুসিক্ত আবেগ দেখেছি। আমার কাছে সে তখনো এক রমণী-ই ছিল মাত্র। একজন কবির চির আরাধ্য; জগতের সবথেকে রহস্যময় সৃষ্টি!
কিন্তু তৃতীয়দিনে আর তা হয়নি। স্বার্থপরতার মুখোশ পড়ে থাকা আমার ‘কবিসত্ত¡া’-ই বিদ্রোহ করেছে। ব্যাথাক্লিষ্ট মেঘপরীর মুখ আমার ভেতরে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। মেঘপরীর চোখের উদাসীন মেঘ আমার ভেতরে ঝড়ো হাওয়া হয়ে বয়েছে। কেনো ? আমি জানিনি, জানি না।
তবে আমি জেনেছিলাম মাত্র আঠারো-উনিশ বছর বয়সে বাবা-মা, ভাইবোন ছেড়ে ভিনদেশে আসার যন্ত্রণা এটা নয়। মেঘপরীর এই কষ্ট, যন্ত্রণার জন্ম অন্য কোথাও। যে কষ্ট কাউকে দেখানো যায়না, দেখাতে হয়না। সেও কাউকে জানতে দিতে চায় না। তাই হোস্টেলের বাইরে এসে নির্জনে বসে থাকে, কাঁদে।
নিজের ভেতরের অপরাধবোধ কিনবা গøানি প্রশমনের জন্য কিনা জানি না, মেঘপরীর কষ্ট জানতে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। নতুবা আমি হয়তো চেয়েছিলাম তার ভেতরে থাকা কষ্টের কথাগুলো সে কাউকে বলে শান্ত হোক। নিজের অজান্তেই সেদিন আমি তাই অদ্ভুত একটা কাজ করলাম। মেঘপরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট্ট একটা কাগজে লিখে নিয়েছিলাম ,
” চুপটি করে বসে কেন অশ্রু টলমল;
তোর দু’চোখে বিষাদ কেনো
মেঘপরী তুই বল, বল আমাকে বল।”
আমি যখন চিরকুটটা মেঘপরীর হাতে দিয়ে বলছিলাম, ” মেয়ে শোনো, তুমি যে কষ্ট পাচ্ছো তার উৎস আমার জানা নেই। জানতে চাইও না। তবে তোমার কষ্ট খুব স্বাভাবিক কোনো কষ্ট নয় , বুঝতে পারছি। সেদিক থেকে তুমি ভাগ্যবান। পৃথিবীতে অজানা অব্যক্ত যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া মানুষের খুব কম, তুমি তাদের একজন। আমার কথাগুলো শুনে সে অবিশ্বাস্য আর বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়েছিল আমার দিকে। হঠাৎ করে কেউ একজন সামনে দাঁড়িয়ে হাতে একটুকরো কাগজ ধরিয়ে দিয়ে এরকম অঅদ্ভুতুড়ে কথা বলবে সে তা কখনো আশা করেনি। আমি আর থাকিনি, তার এই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলে আসছিলাম। পেছন ফিরতেই সে ” আপনি….” বলে থেমে গেল। একটু সময় নিয়ে আবার বললো,” আমি কিছু বোঝে না ।”
আমি তার দিকে ফিরে হা করে তাকিয়ে থাকলাম কথাগুলোর অর্থ উদ্ধারের জন্য। মনে পড়লো, এই মেয়েটা মাত্র মাসখানেক হলো কাশ্মীর থেকে বাংলাদেশে এসেছে। এই সময়ে ওর ‘আমি’ ‘তুমি’ ‘আপনি’ এই জাতীয় শব্দগুলোর অধিক বাংলা বলতে পারার কোনো কারণ নেই । আর আমার লেখা কথাগুলো পড়া, সেতো রীতিমতো অসম্ভব! সে হয়তো বলতে চেয়েছিল,”আপনি কী বলেছেন আমি তার কিছুই বুঝতে পারিনি।”কিন্তু ‘আপনি’ বলে আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই অনেক কষ্টে খুঁজে বিকৃত বাংলায়,”আমি কিছু বোঝে না” বলেছে। আমি আবারো মেঘপরীর দিকে তাকালাম। তার চোখে তখনো অবিশ্বা, বিস্ময় আর প্রশ্ন!
এরপর অনেকদিন কেটে গেলো। এরমধ্যে মেঘপরীর সাথে আমার আরো কয়েকবার দেখা হয়েছিল। প্রতিবারই সে দূর থেকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছে আমার দিকে। দু’একবার কথাও বলতে চেয়েছিল হয়তো, ভাবভঙ্গিতে অন্তত তাই মনে হয়েছে। আমি পাত্তা দিইনি, বলতে হবে রয়েসয়ে পালিয়ে থেকেছি। অজানা ব্যাথায় কুঁকড়ে যাওয়া মেঘপরীর কান্না আমাকে সেদিন আপ্লুত করেছিল সত্যি, আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম মেঘদলের এই মেয়েটার সমস্ত কষ্ট শুষে নিক কষ্টের দেবী। হাসুক সে। মেঘে ঢাকা তার দু’চোখে রঙিন স্বপ্নের ঝিলিক জ্বলুক। কিন্তু ওইটুকু পর্যন্তই, সেদিন পর্যন্তই।
আমার অনুভূতির পাতায় আমি তার জন্য আর কোনো জায়গা রাখিনি। বরং স্মৃতির ফ্রেমে জমানো সকল রঙ মুছে ফেলেছিলাম। সেদিনের সেই চিরকুট দেয়ার হাস্যকর কথা মনে পড়লেও বিরক্ত হয়েছি বারবার। আমি আর কোনো দিনও ওই পথে যাইনি। মেঘপরী আর মন খারাপ করে বসে থাকে কিনা জানতে চাইনি। আমি জানতাম আবার ওখানে গেলে আমি বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়বো। বৃত্ত আমি বড্ড ভয় পাই। বন্দীত্বে আমার বড্ড অনাসক্তি।

দুই.
মেঘপরীর ফোন পেয়ে আমার যখন ঘুম ভাঙে তখন সকাল ন’টা বাজে। ফোন ধরতেই সে ভাঙা বাংলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বললো,”শুভ নববর্ষ।”
মেঘপরীর কণ্ঠ শুনেই আমি বুঝেছিলাম এটা সে। কিন্তু আমাকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য সকালবেলা সে ফোন করবে তা ভাবতে পারিনি। আমি তাই তার কথার উত্তরে বললাম,”খাইছে আমারে।” ওপাশ থেকে চিকন স্বরের হাসির শব্দ আসলো। আমার কানে ঝনঝন করে বাজলো সে হাসি। হাসি থামিয়ে সে বললো,” আমি আমার হোস্টেলের সব কাশ্মীরিদের মধ্যে সবথেকে ভালো বাংলা বলতে পারি, জানেন? আচ্ছা, আপনি এখন একবার আমার সাথে দেখা করতে পারবেন? প্লিজ।” ভাঙা ভাঙা বাংলায় কষ্ট করে হলেও গুছিয়েই কথাগুলো বলেছিল সে। আমি অবাক হলাম। এতো কম সময়ে সে এতো ভালো বাংলা বলা কী করে শিখলো, এই ভেবে ।
আমি যখন মেঘপরীর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম আমার বিস্ময়ের তখন সীমা ছিল না। সাথে কিছুটা অস্বস্তিও ছিল হয়তো। আমার অস্বস্তির কারণ, আমি বাঙালি ছেলে হয়েও পহেলা বৈশাখে জিন্স -প্যান্ট, বাঁদরের ছবিওয়ালা টিশার্ট আর স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়ে মেঘপরীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তবে অস্বস্তিকে আমি পাত্তা দিইনি। বাহ্যিক চলাফেরায় আমি কোনোকালেই মনোযোগী ছিলাম না। উৎসব, সাজগোজ আমাকে কখনোই টানেনি।
তবে মেঘপরীকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভিনদেশী, ভিন্নসংস্কৃতির একটা মেয়ে কী চমৎকার বাঙালি রমণীর সাজে সেজেছে তখন! খোলা চুল, কপালে মাঝারি একটা লাল টিপ, হাতে নানান রঙের চুড়ি, গলায় বড় বড় পুতির মালা আর লাল-সবুজ-কমলা রঙ মিলে একটা শাড়ি পড়েছিল সে। আমি মুগ্ধ হয়ে ছিলাম সত্যিই। মেঘপরী হঠাৎ আমাকে বলেছিল,” আপনি আমার চোখের বিষাদের কারণ জানতে চেয়েছিলেন, না ? শুনবেন ?”
মেঘপরী আমাকে তার চোখের মেঘ আর বিষাদের গল্প বলেছিল। বলেছিল প্রথম অনুরাগের প্রতারিত হওয়ার গল্প। বলেছিল অব্যক্ত বেদনা আর নীলকষ্টের গল্প। বলতে বলতে তার চোখে আবারো মেঘ জমেছে, বিষাদ ভর করেছে বিষণ্ণ চোখের তারায়। মেঘপরীর চোখ আমাকে আবারো বিমর্ষ করেছিল। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, “তোমার চোখের মেঘটুকু আমাকে দেবে মেঘপরী? আমি হাজার জনমের বর্ষা হবো!” আমি বলিনি কিছুই। চলে আসছিলাম মেঘপরীকে রেখে। বৃত্তে আটকা পড়ার ভয় আমার চির কালের। বৃত্ত আমি ভীষণ ঘৃণা করি ।
মেঘপরী আমাকে পেছন থেকে ডাকলো,” আমি ঘুরতে যাবো। আমি যদি বলি আমার সাথে ঘুরতে যেতে, আপনি কি ‘না’ বলবেন?” আমি একটু ভাবলাম।আমি বুঝেছিলাম কাজটা ঠিক নয়। তবুও মুখে না শব্দটি বলতে পারিনি। কেবলমাত্র উপরে নিচে ঘাড় নাড়লাম। মেঘপরীর মুখে মুহূর্তেই অন্ধকার ভর করলো। তার চোখে আবার মেঘ জমতে শুরু করেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না সমস্যা কী হলো? কী এমন করলাম আমি। মুহূর্তেই আমার সব মনে পড়লো, একটা চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত হলো বুকের বাঁপাশ…
এরপর সম্পর্ক আর বন্ধন থেকে পালিয়ে বেড়ানো কবিকে মেঘপরীর সাথে দেখা যায় এই উৎসবে। যে মেঘপরীর চোখের হাজার জনমের বর্ষা হতে চেয়েও পালিয়ে বেড়িয়েছে তার থেকে।
রিজভী আহমেদ
এমবিবিএস, পঞ্চম বর্ষ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

আফা, একটা ফুল লইবেন? লন না একটা?
সদ্য খোলা কাঁচের জানালায় উঁকি দিয়ে কথাটি বলল তারা । গাড়ির মধ্যে কারো উপস্থিতি ¯পষ্ট হওয়ার আগেই কাচটি উঠে গেল। তারা এখন নিজের চেহারা নিজেই দেখছে। দেখতে ভালোই লাগছে তার । যেন আরেকটা তারা তার সাথে মাথা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। মুহূর্তে এমন আয়না পেয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে পা বাড়াল। যদিও রুক্ষ চুলগুলো তার হাতের কোমল ¯পর্শকে কোন পাত্তাই দিল না।
তারার বয়স আট কিংবা নয়। জন্মমুহূর্ত থেকে মাকে হারিয়েছে। তাই মা স¤পর্কে বিস্তারিত জানে না সে। শুধু একবার বাবার কাছে শুনেছে মা মারা যাওয়ার শেষ মুহূর্তে নাকি আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে ছিল তাই তার নাম তারা। গত দুই বছর ধরে বাবাও কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফুলবানুর সাথে থাকে তারা। আর ফুলবানুকেই তারা মা বলে ডাকে। ফুলবানুও তার আর দুটি সন্তানের মত তারাকে আগলে রাখার চেষ্টা করে। আর আগলে রাখার কারনটা যতটা না মানবিক, তার থেকে বেশী অর্থনৈতিক। কারন খুব ছোট থেকেই তারা সংসারে বেশ সাহায্য করে চলেছে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেশ মোটা টাকার ফুল বিক্রয় করে সে। তারা যখন শোনে ফুলবানু তার আসল মা নন, তখন একটুও বিচলিত হয়নি সে। বরং হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে সেই হাসির মধ্যে যে অবিশ্বাস ছিল তা নয় বরং মা থাকা না থাকার মধ্যে যেন তার বিন্দুমাত্র কিছু আসে যায় না।
এক বালতি ফুল হাতে তারা আবার ছুটে চলে। বাংলামটর আর কাওরান বাজারের এই রাস্তায় তারাকে পাওয়া যায় প্রতিদিন। পথের মাঝে স্থির হওয়া গাড়ির সারিতে হেটে বেড়ায়। একটাই উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্যটাই তার দৈনিন্দন স্বপ্ন। বালতির ফুলগুলো যেন সে তাড়াতাড়ি শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারে। কিন্ত অধিকাংশ গাড়ির জানালা বন্ধ থাকে। যদিও বাসগুলোর জানালা খোলা থাকে তারা তা নাগালে পায় না। কি আর করার, তাই তারা তার সমান গাড়িগুলোর জানালা অনুসন্ধিৎসু চোখে খুঁজতে থাকে। ইদানীং একটা অনুভ‚তির সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কোন গাড়ির জানালা খোলা দেখলেই তার মনের কোন একটা জানালা খুলে যায়। আর সেই জানালা দিয়ে বের হয়ে আসে একটি সুখের ঝলক। এ গাড়ি থেকে ও গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু পথ পার
হয়ে এসেছে।
অসংখ্য গাড়ির ভিড়ের মধ্যে তারা খেয়াল করল তার থেকে একটু দূরে একটি গাড়ির জানালা খোলা। তারার গন্তব্য এখন সেখানে। জানালার নিকটবর্তী এসে থেমে গেল সে। দেখল ঠিক তার বয়সি একটি ছেলে গাড়ির মধ্যে বসে ফল খাচ্ছে। তারা আর জানালার কাছাকাছি গেলনা। কি মন হল দূর থেকেই দৃশ্যটা দেখতে লাগল। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ফলগুলো তার চেনা। প্রথমে আপেল তারপর কমলা আর সবশেষে আঙুর খেতে দেখল সে। এতে কোন সন্দেহ নাই। তারা নিঃসন্দেহে যে ফলগুলে চিনতে পেরেছে তাতে যেন তার মনে একটা ভাল লাগা কাজ করছে। শুধু তাই নয়, তারা যখন অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল সে চাহনির মধ্যে কোন লোভ ছিল না। সে চাহনি যে কেউ দেখলেই বলে দিতে পারবে তার মর্মার্থ। যার সংক্ষেপন হল ‘থাক না,খেতে কেন হবে। এই যে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছি এটাইতো পরম পাওয়া।’
তারার চাহনিটা তখনই ব্যত্যয় ঘটল যখন সেই জানালা দিয়ে ফলের উচ্ছিষ্ট সমেত একটি পলিব্যাগ তার সামনে এসে পড়ল। তারার দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল রাস্তায় সদ্যফেলা পলিব্যাগের উপর। কি মন নিয়ে ছুটে গেল সে। ঠিক পলিব্যাগটার সামনে এসে একটু থামল তারা। আড়চোখে চারপাশ দেখে নিল কেউ তাকে দেখছে কিনা। আচমকা ছো মেরে তুলে নিল পলিব্যাগটি। আর পিছন ফিরে দেখা নয়, ছুটে চলল সামনের দিকে। মেইনরোড থেকে উপরে উঠে এল সে। কিছু একটা খুঁজছে সে। খুঁজেও পেল।
আর দেরী না করে পলিব্যাগটি ছুড়ে ফেলে দিল ডাস্টবিনে। কাজটি করতে পেরে কেমন যেন একটা ভাল লাগা অনুভ‚তি পায় সে। প্রায়ই এমন করে সে। তারা চায় এই শহরটা সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুক। কিন্তু কেন যে সবাই তা বোঝে না। একটা অজ্ঞাত অভিমান কাজ করে তার মনে।
সারিবদ্ধ গাড়ির গলিতে আবার নামল তারা। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে কিন্তু তার তাপটা এখনও কমেনি। তারা যেদিকেই যাচ্ছে, সূর্যের আলো যেন তার পিছু ছাড়ছে না। হালকা ঘেমেও গেছে সে। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল যেন সূর্যটা মেঘে ঢেকে যায়। আর তার কারনটা নিজের গরমমুক্তির জন্য নয় বরং রাস্তায় স্থীর থাকা যাত্রীদের জন্য। যাত্রীরা সূর্যের তাপের জন্য গাড়ির জানালা খুলতে চায় না।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তবু আজও আশানুরূপ ফুল বিক্রয় করতে পারল না। এদিকে পেটে ক্ষুধা অনুভব করতে লাগল। দুপুরে যে একেবারে কিছুই খায়নি তা নয় কিন্তু তবুও আবার ক্ষুধা পেয়েছে। আর পাবেও বা না কেন! ছোট একটি হাড়ির ভাত ৬ জন খেলে তার ভাগে আর কতোটুকুই বা পড়ে।
অসংখ্য গাড়ির মধ্যে তারার চোখ পড়ল একটি সাদা গাড়ির উপর। যেটার চারিদিকেই বন্ধ। তারাতো মনে মনে ভেবেই ফেলল এটা একটা বাক্স গাড়ি। গাড়িটির গায়ে বেশ বড় করে কিছু একটা লেখা। তারা তা পড়ার চেষ্টা করল। তারা বাংলা লেখা খুব ভাল পড়তে পারে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ঝাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দ্বারা পথশিশুদের একটি স্কুল পরিচালিত হয়। তারা সে স্কুলের নিয়মিত ছাত্রী। স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে লিখতে ও পড়তে পারে সে। শুধু ক্লাসে নয়, চলতি পথে যত বড় বড় লেখা চোখে পড়ে তারা তা পড়ার চেষ্টা করে এবং পড়ে এক অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করে তার মধ্যে। এই যেমন সাদা গাড়িটার লেখাটা পড়ে ফেলল সে যে ুরোহিঙ্গাদের জন্য জরুরী খাদ্য সরবরাহু। লেখাটি পড়ে তারা মনে মনে প্রশ্ন করল, এই রোহিঙ্গাডা আবার কেডা? শুধু প্রশ্নেই শেষ নয়, তারার মনে প্রবল ইচ্ছে জাগল আজ যদি সে রোহিঙ্গা হত তাহলে কতই না ভাল হত! অন্তত তার জন্য খাবার সরবরাহ থাকত!
ক্ষুধা বেড়েই চলল তারার। কিন্ত ফুলতো বিক্রি হল না। যা হয়েছে তা থেকে যদি সে কিছু কিনে খায় তাহলে তার মাকে দিবে কি? তাই তারা ঠিক করল দ্রুত আরো কিছু ফুল বিক্রয় করে তারপর না হয় কিছু খাবে। তারা গাড়িগুলোতে উঁকি দিতে দিতে খেয়াল করল তার চারপাশের স্থির থাকা গাড়িগুলো আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে। আর দেরী নয়, তারা মুহূর্তে দৃষ্টি ঘোরাল কাওরান বাজারের ট্রাফিক সিগনালের বাতির দিকে। দৃষ্টি পড়তেই দেখল সেখানে জ্বলে উঠেছে সবুজ বাতি। মলিন হয়ে গেল তারার মুখ। যেন এক অপ্রাপ্তির সংকেত।
মনমরা হয়ে রাস্তা থেকে উঠে আসছে তারা। তবে দৃষ্টিটা এখনও বাতিটার দিকে আবদ্ধ যে দৃষ্টিতে রয়েছে এক রাশ অভিমান আর ঘৃণা।
তৈমুর রহমান মৃধা
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

একটা টিউশনি করবে?
: কোথায়?
: ষোলশহর।
: ছাত্র না ছাত্রী?
: ছাত্র।অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
: ছাত্র পড়াব না।
: বিরাট পুলিশ অফিসারের ছেলে। বাবা ডিআইজি। ভালো বেতন দেবে। ভালো নাস্তা পাবে। আরে এতো বড়ো পুলিশের ঝাড়–দার হতে পারাও ভাগ্যের। সুপারিশে চাকরিও হয়ে যেতে পারে। দুদিন পর আইজিপি হবেন।
টিউশনি শুধু টাকা নয়, টাকার চেয়ে বড়ো কিছু। এটি বিসিএস- প্রস্তুতির একটি মোক্ষম কৌশল, টাকা তো আছেই। রাজি হয়ে যাই রাজীবের প্রস্তাবে।
রাজীব বলল : বেতন মাসে আটশ টাকা।
সে সময় আটশ অনেক মোটা অঙ্কের টাকা। এত আকর্ষণীয় বেতনের টিউশন রাজীব নিজে না-করে কেন যে আমাকে দিচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। কিছু সমস্যা তো আছেই!
: তুমি করছ না কেন?
: আমার সময় নেই।
ডিআইজি সাহেবের ছেলের নাম ওমর। ফর্সা, তবে ধবধবে নয় কিন্তু বেশ মায়াময়। বিশাল বাসা, বারান্দায় দামি ফুলের টব। চারিদিকে সমৃদ্ধির ছড়াছড়ি। রাজীব আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ওমর সালাম দিয়ে বলল : স্যার, বিড়াল প্রথম রাতেই মেরে ফেলা উচিত। আমার কথা নয়, আমার ডিআইজি বাবার কথা, ঠিক না?
: ঠিক। কিন্তু বিড়াল কোথায়?
: আছে স্যার, আছে। অনেক বড়ো বিড়াল।
: আমি বিড়াল মারব কেন?
: একটা কথা বলব?
: বলো।
: আগের কথা আগে বলে দেওয়া ভালো। রাখলে আমারও লাভ আপনারও লাভ। নইলে দুজনেরই ক্ষতি। আমি চাই না আপনার ক্ষতি হোক।
: কী কথা বলে ফেল।
ওমর বলল : আপনার বেতনের চল্লিশ পার্সেন্ট আমাকে দিয়ে দিতে হবে। আপনার বেতন আটশ টাকা। চল্লিশ পার্সেন্টে হয় তিনশ বিশ টাকা। তবে আমাকে তিনশ টাকা দিলেই হবে, বিশ টাকা আপনার বখশিস। কী বলেন স্যার?
প্রথমে মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে। ইচ্ছে করছিল ঘুরিয়ে একটা চড় দিই। হাত এগিয়ে নিয়েই থামিয়ে ফেলি। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক করে ফেলি আমাকে। তারপর সহজ গলায় আদর মেখে বললাম : কম নেবে কেন বাবা?
: এমনি।
: না, আমি পুরো তিনশ বিশ টাকাই দেব।
: তাহলে স্যার ভাংতি দিতে হবে। আমি একশ টাকার নিচে ভাংতি রাখি না।
: তাই হবে।
বিচিত্র অভিজ্ঞতার আশায় আমার মনটা ফুরফুরে হয়ে ওঠে। মজার হবে টিউশনিটা, দেখি কতদূর যেতে পারে ওমর। মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে আমি একটি খামে করে তিনশ বিশ টাকা ওমরের হাতে তুলে দিই।
ওমর যথাসময়ে টাকা পেয়ে খুশি।
হাসি দিয়ে বলল : স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ।
আমি বললাম : তুমি আমার কাছ থেকে শিখছ আর আমি শিখছি তোমার কাছ থেকে। পর¯পরের বেতন যথাসময়ে দিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে শ্রমের মর্যাদা মাসের প্রথমদিকে হাসার সুযোগ পায়।
ওমর বলল : থ্যাংক ইউ স্যার। সব মানুষ যদি আপনার মতো হতো!
চার মাস পর ডিআইজি সাহেব পড়ার রুমে এলেন। এতদিন তাকে একবারও দেখিনি, বেশ গম্ভীর চেহারা, দেখলে সমীহ আসে। চোখের চশমায়, দামটা পুলিশের পোশাকের মতো ঝিলিক মারছে, হাতের ঘড়িতে আরও বেশি। তিনি ওমরের একটি খাতা হাতে
তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন : মাস্টার সাহেব, আপনার বেতন চারশ টাকা বাড়িয়ে দিলাম।
: কেন স্যার?
আমরা পুলিশের লোক। গুণীর কদর করতে জানি। এ পর্যন্ত কোনো শিক্ষক আমার ছেলের কাছে দুই মাসের বেশি টিকেনি। প্রত্যেকে আমার ছেলেটাকে বকা দিয়েছে, মেরেছে, অশ্রাব্য কথা বলেছে। ছেলে কেবল আপনারই প্রশংসা করেছে। আপনি নাকি
অনেক ভালো পড়ান।
তিনি একটা কলম ও একটা ডায়েরি আমার হাতে দিয়ে বলেন : এগুলোর আপনার উপহার।
: থ্যাংক ইউ স্যার।
কলমটা ছিল সম্ভবত পার্কার। তখন তো আর মোবাইল ছিল না, ওই সময় পার্কার ছিল আমাদের কাছে স্মার্ট ফোনের মতো লোভনীয়।
ডিআইজি সাহেবে চলে যেতে ওমর বলল : স্যার।
তুমি কী কলম আর ডায়েরি হতেও ভাগ চাইছ?
ওমর হেসে বলল : না স্যার। বস্তুতে আমার আগ্রহ নেই। টাকা হলে সব বস্তু পাওয়া যায়।
: তবে?
: আমার পাওনা এখন চারশ আশি টাকা। আমি আশি টাকা নেব না, একশ টাকা নেব। তার মানে পাঁচশ টাকা।
: ঠিক আছে। খুব বেশি না হলে আমার বেশি দিতে কষ্ট লাগে না। তুমি আমার শিক্ষক, তোমাকে বিশ টাকা বেশি দিতে না-পারলে আমার জ্ঞান অর্জন হবে কীভাবে?
ওমরের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। কমিশন নিলেও পড়াপাড়ি বেশ ভালোই হচ্ছে।আরও তিনি মাস কেটে যায়। এরমধ্যে, আমার বেতন আরও দুইশ টাকা বেড়ে গেছে। ওমরকে এখন টাকা দিতে কষ্ট হচ্ছে না। জীবনে প্রথম শেখলাম– দেওয়া- নেওয়ার
মাহাতœ। ওমর একটা জীবন্ত স্মার্ট ফোন।
সেদিন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ওমরকে অন্যদিনের চেয়ে বেশ আনমনা মনে হচ্ছে।
বললাম : কী হয়েছে?
: স্যার, আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।
: কী কাজ?
: একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।
: চিঠি তো লিখেই দিই।
: স্কুলের চিঠি নয়।
: কোন চিঠি?
: আমার প্রেমিকা, সরি স্যার বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য।
: কী লিখব?
: আপনার মতো করে আপনি লিখে দেবেন। আমি তাকে ভালোবাসি। তাকে না- দেখলে বুকটা কেমন মোচড় খায়। কিছু ভালো লাগে না। সে খুব সুন্দর।
চিঠি লিখে দিলাম গভীর ভাষায়, প্রেমের মমতায়।
রাস্তায় এসে ইচ্ছেমতো হাসলাম। ওমর আর রেহাই পাচ্ছে না। বাসে উঠতে গিয়ে দেখি, ফারহাদ। আমার ক্লাসম্যাট এমদাদের ছোট ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে। সাবজেক্টটা ঠিক মনে পড়ছে না।
আমাকে সালাম দিয়ে বলল : ভাইজান, আমাকে একটা লজিং দেবেন?
: আমি তো লজিং নিয়ে থাকি না। এমদাদের কাছে অনেকগুলো লজিং আছে। আমাকেও বলেছে, কাউকে পেলে খবর দেওয়ার জন্য। তাকে গিয়ে বলো।
: বলেছিলাম, দেবে না।
: কেন?
: সে আমাকে লজিং দেবে না।
ফরহাদকে বিদায় করে নিজের রুমে চলে যাই। শুক্রবার বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যাবার কথা কিন্তু যাওয়া হলো না। ওমর খবর পাঠিয়েছে, শুক্রবার তাদের বাড়ি যেতে হবে। তার শুভ জন্মদিন।
কী নিয়ে যাই?
অনেক চিন্তাভাবনা করে ওমরের বান্ধবী নিহা নিশিতাকে দেওয়ার জন্য একটা চিঠি লিখি। ওমর চিঠি পড়ে এত খুশি হয় যে, সে মাসের পুরো কমিশনটাই আমাকে ফেরত দিয়ে দেয়।
অবাক হয়ে বললাম: ফেরত দিলে যে?
ওমর আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল: আপনার লেখার সম্মানি। স্যার, চিঠিটা একদম ফাটাফাটি হয়েছে।
লেখার সম্মানি! আমি চমকে উঠি। লেখার প্রথম আয়, এ তো বিশাল কারবার! তাহলে কেন এতদিন লিখিনি! ওমরের উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে পত্রিকায় লেখা শুরু করি। তারপর আস্তে আস্তে লেখা আমার নেশা হয়ে যায়।
যতই গল্প করি, যতই প্রেমপত্র লিখে দিই না কেন,
লেখপড়ায় ওমরকে এমন কৌশলে ব্যস্ত রাখি যে, সে ধীরে ধীরে বইয়ে ঝুঁকে পড়ে, তার সব আনন্দ অন্যান্য জায়গা হতে বইয়ের পাতায় এসে ভীড় করতে শুরু করে। আগে তার বাবাকে বলত চকলেটের কথা, এখন বলে বইয়ের কথা। আগে ইলেকট্রনিক্স
সামগ্রীতে তার আলমিরা ছিল ভর্তি; এখন সেখানে ঠাঁই পেয়েছে এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিট্রানিকা, পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকদের নানা বই। আমার কাছ থেকে নাম নিয়ে যায় বইয়ের, নিয়ে আসে তার বাবাকে দিয়ে। দেশে না পেলে বিদেশ থেকে। কত দামি দামি
বই, আমার কাছে মনে হতো: সামর্থ্যবানদের ইচ্ছাই প্রাপ্তি।
আরও তিন মাস পর আমার বেতন হয় পনেরশ টাকা। বিশাল অঙ্ক, অনেকই তখন এত বেতন পেতেন না। এখন ওমরের পাওনা গিয়ে দাঁড়ায় ছয়শ টাকায়।
মাসের শেষদিন ওমরকে ছয়শ টাকা দিতে যাই। লজ্জায় চোখটা নিচু করে ফেলে সে। আগের মতো দ্রুত হাত এগিয়ে দিচ্ছে না : সরি স্যার।
: নাও তোমার টাকা।
: লাগবে না স্যার।
: আরে নাও। আমি অত টাকা দিয়ে কী করব?
: স্যার, একমাসে যতটাকা আপনাকে দিই, আমি একদিনে তার চেয়ে অনেক বেশি দামের চকলেট খাই। একটা চকলেটের দাম একশটাকা, দিনে বিশটা চকলেট আমি একাই খাই। বাবার হুকুমে সুইজারল্যান্ড থেকে আসে।
তারপরও আমি বললাম : নাও।
: লাগবে না স্যার।
: আগে লাগত কেন?
তাস খেলতাম, নিহা নিশাতকে দিতাম। এখন তাস খেলা সময় নষ্ট মনে হয়, বই পড়ি। নিহা নিশাতকে যতক্ষণ দিই ততক্ষণ খুশী থাকে, শুধু চায় আর চায়। বই শুধু দিয়ে যায়, কিছুই চায় না।
আমি সাফল্যের হাসি নিয়ে বের হয়ে আসি।
বার্ষিক পরীক্ষার পর ওমরদের বাসায় যাওয়া বন্ধ হয়ে যাই। ডিআইজি সাহেব বলেছেন এক মাস পর থেকে আবার পড়ানো শুরু করতে। আমার মতো ভালো মাস্টারকে তিনি ছাড়বেন না। বদলি হলে সেখানে নিয়ে যাবেন।
পনের কী বিশদিন পর দেখি আমার মেস-বাসার সামনে একটা বিরাট গাড়ি দাঁড়িয়ে। দেখলে বোঝা যায় বড়ো পুলিশ অফিসারের গাড়ি।
হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আসি।
ওমর আর তার বাবা গাড়ি হতে নামছেন।
ডিআইজি সাহেব বললেন: মাস্টার সাহেব, আমার ছেলে বার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছে। এর আগে কোনোদিন পঞ্চাশেও ছিল না। এক বছরের মধ্যে আপনি আমার ছেলেটাকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এটি আমার কাছে অলৌকিক মনে হয়।
প্রশংসা আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ বইয়ে দিল।
ডিআইজি সাহেব আমার হাতে একটা ঘড়ি তুলে দিয়ে বললেন: আমার ছোট ভাই আমার জন্য সুইজারল্যান্ড থেকে এনেছেন। আপনাকে দিলাম। এটি কোনো বিনিময় নয়, উপহার; ভালোবাসার নিদর্শন।
আনন্দে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এমনভাবে কেউ আমাকে কোনোদিন এমন উপহার দেননি।
ওমর আমার পায়ে ধরে সালাম করে বলল: স্যার, আপনি আমাকে বদলে দিয়েছেন।
ডিআইজি সাহেব ওমরের এমন আচরণে আবেগপ্রবণ হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেন: মাস্টার সাহেব, ওমর আমাকেও পাত্তা দিত না। এ পিচ্চি ছেলের কাছে আমি ছিলাম কেবল টাকার-ঝুড়ি। আপনি তাকে জানোয়ার থেকে মানুষ করে দিয়েছেন। বলুন কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
বললাম : ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।
: আপনি আমার কাছ থেকে কী চান?
: ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।

মোঃ শাহাদাত হোসেন তালুকদার
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাবা কখনই আমার উপর রাগ করেন না । সবেতেই সায় ।
..
‘বাবা আজ না বল্টুদের গাছে গুলতি মেরেছি । জানো ঐ গুলতি না বল্টুর মাথায় লেগেছে । ভাগ্যিস কেউ দেখেনি’
বাবা কিচ্ছু বললেন না, একটু বকলেন না পর্যন্ত ! শুধু ঠোটের কোনে মুচকি একটু হাসলেন ।
আমার ধারণাটা অবশ্য ভুল, বল্টু ঠিকই টের পেয়েছে এইটা আমার কাজ । দৌড়ে আসার সময় হয়তো দেখেও থাকবে । বিকেলে বল্টুর মা এসে যাচ্ছেতাই বলে গেল, মুখের ভাষার সে কি ছিরি।

চাচী আম্মা আমায় আচ্ছামত পেটালেন, তবুও বাবা কিচ্ছু বললেন না। এত গরমেও কাশ্মীরি শাল গায়ে বসে রইলেন । আমার অবশ্য তেমন একটা লাগেনি, বলতে গেলে লাগেনা আরকি । ভেবে নিই মা আমাকে কোলে নিয়ে ছোটবেলার মত আদর করছে,
তাহলে মারের ‘ম’ টাও কাছে আসতে পারে না ।যদিও মার চেহারাটা শেষ কবে দেখেছি মনে পড়ে না, কিন্তু কল্পনা করতে তেমন অসুবিধে হয় না।

আজ প্রায় ৯ বছর হচ্ছে আমরা চাচার বাড়িতে। আমরা বলতে আমি আর বাবা। মা সেই কবেই ছেড়ে চলে গেছে। চাচী আম্মা মাঝে সাঝে ই নোংরা নোংরা কথা বলেন মাকে নিয়ে, ‘এ কেমন কপালপুরি রে বাবা! কি যে পাপ ছিলো গোপনে, শুধু আমাদের বোঝাটা বাড়িয়ে দিয়ে গেল… আরো কত কি! আর সব শেষে কেমন করে জানি নাক সিটকে বলত ছ্যা ছ্যা ছ্যা।
.
আমি ওসব কথায় কান দিই না। বাবা বলেছে মা আমায় খুব ভালবাসত, তাই আমার ও উচিৎ তাকে ভালবাসা। তাই আমি ওসব শুনি না। মাঝে মাঝে অবশ্য দু একটা কথা কানে এলে এক আধটু কান্না পায়, তবে আমি সামলে নিই। মা থাকার আর না থাকার পার্থক্যটা আমি ধরতে পারি না! শুধু মায়ের কথা মনে পড়লেই কেমন একটা মোচড়ানি দেয় বুকের বাম দিকে। তখন চোখের কোন দুটো টেনে ধরি। চোখের জল চোখেই গড়িয়ে যায় আর কান্না পায় না। এটা অবশ্য আমি বাবার থেকে চুপিচুপি শিখেছি। বাবা যখন কাঁদত তখন এভাবে সামলে নিত। মজার না?
. .
বাবা সারাটাক্ষণ চেয়ারে বসে থাকেন। ঐ চেয়ারটায় যে কি আছে সেটাই বুঝে উঠতে পারলাম না। পাশের বাড়ির সোবহান চাচা তো এই বসে থাকতে থাকতেই প্যারালাইজড হয়ে গেলেন। বাবাকে কত করে বললাম, ‘ওঠ ওঠ, সোবাহান চাচাকে দেখলে না কেমন হয়ে গেছে ওরকম কিন্তু তোমার ও হবে, হ্যাঁ। উঠে পড়’
তার কি আর আমার কথা কানে যায়, ঐ বসেই রইলেন। মাঝে মাঝে বড্ড অভিমান হয়, ‘আমি ছোট বলে কি আমার কথা শুনতে নেই!
‘দেখ ওরকম হলে কিন্তু বলতে পারবে না আমি সাবধান করি নি, হ্যাঁ’ বলেই ছুটে বল্টুর সাথে খেলতে যাই। বল্টুটা কেন জানি খুব ভালো। কাল চকলেট দিয়ে সব মিটমাট করে নিয়েছে, বাবা পচাঁ খুব পচাঁ। বাবা বই পড়তে খুব ভালবাসতেন। এইত এখন ও কোলের ওপর কবিতার বই রেখে বসে আছেন। আমিও পড়তে শিখে গেছি, সুর করে সংকল্প কবিতাখানা বেশ পড়তে পারি। বাংলা স্যার তো বলেই দিয়েছেন, সামনের অনুষ্ঠানে আমাকে দিয়ে কবিতা
পড়াবেন। বাবার পুরোনো ট্রাংকে বেশ কটা কবিতার বই আছে। আমি মাঝে মাঝে চুপিচুপি বের করে পড়ি, বাবা দেখলে আর নিস্তার নেই।
– –
‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের………’

ধ্যাত্তোর এ কি লিখেছে, হাজার তো ঐ একের পরে তিনটে শূণ্য আর পৃথিবী নাহয় বুঝলাম, কিন্তু ঐ সিংহল টা আবার কোন প্রাণী হে ?
আমার ছোট্ট মাথায় এই কবিতা দিয়ে কোন কাজ নেই, এর থেকে আমার সংকল্প ঢের ভাল।
– –
আজ চাচী আম্মা আমায় খুব মেরেছে, পিঠে একদম কালচে দাগ পড়ে গিয়েছে। অপরাধ প্লেট ভেঙ্গে ফেলেছি। আমার অবশ্য তেমন লাগেনি, মহাষৌধ আছে না। এরপর বল্টুর সাথে খেলেছি। সন্ধ্যেয় সংকল্প কবিতা পাঁচ বার লিখেছি। এখন রাত আটটা বাজে, বাবা এখন ও সেই বসেই আছেন। কোলে কবিতার বই, গায়ে কাশ্মিরী শাল আর ঠোঁটে মুঁচকি হাসি।

আমার না হুট করে খুব কান্না পায়। অভিযোগ করতে ইচ্ছে হয়, ‘জানো বাবা চাচীআম্মা আজ আমাকে খুব মেরেছে, বল্টু বলেছে পিঠে ইয়া মোটা মোটা দাগ উঠেছে। আমার না একটুও লাগেনি। মাকে হতভাগী,কপালপোড়া মেয়েছেলে বলেছে তাও খারাপ লাগেনি। জানো বাবা তোমাকে খারাপ বলেছে, তোমাকেও মেরেছে। এই দেখ তোমার কাঁচগুলো কেমন ভেঙ্গে গিয়েছে। আমার খুব খারাপ লেগেছে। তোমার খুব লেগেছে না বাবা ? ও বাবা তোমার খুব লেগেছে না ? বাবা তুমি বেড়িয়ে এস না কাঁচের ওপাশ থেকে। তুমি শুধু একটাবার বেড়িয়ে এস, দেখ আমি চাচী আম্মার কি করি। ও বাবা বাবা ‘….
আমি চোখের কোন টেনে ধরি, আজ আর চোখের জল বাঁধ মানে না। এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে গড়িয়ে পড়ে ৫ বছরের পুরনো ভাঙ্গা কাঁচের ফ্রেমের ওপর।
সে জল মুঁচকি হাসতে থাকা লোকটার ছবির চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, ধীরে খুব ধীরে।

সামিহা আতিকা
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

হালকা বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে মেঘ গর্জন দিয়ে উঠছে একটু পরপর। আনমনে হয়ে দূর দিগন্তে দৃষ্টি ফেলে আমি তা টেরই পেলাম না। পুরনো দোতলা ভবনের ছাদ। সামনেই দুটো মেয়ে দৌড়াদৌড়ি করে ছাদের কাপড় তুলতে ব্য¯ত হয়ে পড়ল। ওদের ব্য¯ততা দেখেও আমার ঘোর কাটল না। না,আমি মোটেই প্রেমের কথা বলছিনা। স্কুল জীবনে সবাই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখত। এত সহজ সরল ছেলে প্রেম বুঝে? বুঝতাম না তখন, এখনও হয়তো তা-ই। বাবা একবার বলেছিলেন, মানুষের সাথে মানুষের প্রেম শেষ হয়ে যায়, কিন্ত একটা জিনিস সবসময় থেকে যায়। আমি বললাম,কী? বাবা সেদিন হেসেছিলেন আর বলেছিলেন, বলে যাব একদিন, চলে যাবার আগে। কিন্তু বলে যাননি। সেদিন থেকে প্রতি রাতে তা নিয়ে ভেবেছি,ভেবেছি আর বিষন্ন হয়ে কখনো পুলকিত হয়েছি। আজ যতবার তা নিয়ে ভেবেছি বৃষ্টির মধ্যে চোখ বারবার ভিজেছে, টের পাইনি।

বাবা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। একুশ বছর বয়স বোঝার আগেই তার বোঝাটা টের পেতে শুরু করলাম কিছুটা। মা কেমন মনমরা হয়ে পড়ল,বাড়ি থেকে বের হয় না। ছোট ভাই আমার বয়েসের তাড়নায় যত প্রকার কাজ আছে তা সারতে লাগল। আমি দু পয়সা রোজগার করি,সংসার চলে। যদিও রিনির সাহায্য আর পরামর্শ ছাড়া আমার একটি বেলাও পার হতে চায় না। রিনির সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন বাবা,কথাও দিয়েছিলেন রিনির বাবাকে।তার এ বাড়িতে বেশ যাওয়া আসা ছিল। বাবার বন্ধুর মেয়ে। আমি কখনওই তাকে নিয়ে ব্য¯ত ছিলাম না, বরং সে সর্বক্ষণই আমাকে, ছোট ভাইকে আর বিশেষ করে আমার আধমরা মা কে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করিতে চাইত। মা চাইলেন তাকে নিয়ে আসতে। মার চাওয়াই আমার চাওয়া। মেয়েপক্ষ আর আমার মা সকলেই প্রস্তুতি সারলেন। আমার মনে কোন উত্তেজনা ছিল না। কারন বিয়েটা শখের বিয়ে নয় প্রয়োজনের বিয়ে।
এরই মধ্যে একদিন বোধ করি, মেয়েটি রাত্রি বেলা বাসযাত্রা শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে।বাড়ির কেয়ারটেকার সিরাজ কি মনে করে মা কে খবরটি দিয়ে গেলন। আমি সেদিন কতবার, কত রকমে, কত কৌশলে ছুটে যেতে চাইলাম। কিন্ত মা বলল, না। আমি মনের সম¯ত সাহস আর শক্তি এক করে বললাম, আমি বিয়ে করব, আমাকে যেতে দাও মা। মা বললেন, আমার মরা মুখ দেখ। আমার মন ভেঙে গেল। পাথর হয়ে পড়ে রইলাম। ছাদের কোণায় গিয়ে দাড়ালাম। মেঘ ডাকছে, পশ্চিমের ঝড়ো বাতাসে আমার চুল উড়ছে, আকাশের চিলগুলো মরনের ডাক দিয়ে আমার বুকটা শূন্য করে তুলছে। আর আমি? সেদিকে চেয়ে রইলাম শুধু। দু এক ফোটা জল চোখ দিয়ে অযতেœ গড়িয়ে পড়ল। আমি বুঝলাম কথা ভঙ্গ করার মতো লোক আমরা নই। আমরা খানদানি বংশের লোক। তবে কলঙ্ক বলে কথা! কিন্ত এটি বুঝলাম না আমাদের মহত্ত তাহলে কোথায়?
তারপরে দশ পনেরো দিন পার হয়ে গেল। আমি মায়ের আদেশে রিনির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। শীঘ্রই মা আমার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। তাকে দেখার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। একদিন অফিস শেষে এসে দেখি রক্তবমি করছে। ডাক্তার ডাকালাম। যতদূর পারি মার চিকিৎসা চালাতে থাকলাম।ডাক্তাররা বাইরের দেশে নিয়ে যেতে বললেন। আমার সামর্থ্য ছিল না মা কে বাইরে নিয়ে যাবার। বুঝা হয়ে গেল মাকে এভাবেই মরতে দেখা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। বেশ কিছুদিন অফিসে না গিয়ে মার কাছে থাকলাম। এবার মার হুশ ফিরল। মা হঠাৎ কি মনে করে রিনি কে নিয়ে আসার অনুরোধ করল। আর আমিও দেরি না করে ছুটে গেলাম তার বাড়িতে। আতœহত্যা? হ্যাঁ। এরপর? এরপর জানাজা পড়ে এলাম।
পরদিন স্বপ্নে দেখলাম রিনি এক বৃষ্টিতে রাতে জানালার পাশে একা বসে আছে, কাঁদছে, চোখের পানি আচল দিয়ে মুচছে, অপেক্ষা করছে, আমার অপেক্ষা আর মনে মনে বলছে, আকাশ, তুমি কি আসবে না তাহলে?
মা কে আর খুব বেশিদিন কাছে পেলাম না।বাবার শোকে আর আমাদের চিন্তায় সে-ও বিদায় নিল। সেদিন বুঝলাম, বাবা বলেছিল, ‘প্রেম শেষ হয়ে যায়, কিছু জিনিস থেকে যায়’ কথাটার মানে কি।
আজ অনেক কাল পেরিয়ে বয়স একচল্লিশে পা রাখলাম। চোখে, মুখে একুশের কোনও ছাপ নেই। বড় চুল, দাড়ি সবই রেখে দিয়েছি, দেখলে চিনবার জো নেই। বিয়ে করা হয়নি। তবে হ্যাঁ, কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। এখন মোটামুটি মেয়েদের বাস থেকে নেমে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরতে হয় না।
সেদিন মনে হয় রিনির মতো কাউকে দেখেছিলাম। দৌড়ে গলির ভেতর ঢুকলাম। দেখলাম একটি ছেলে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হাসলাম। মার কথা ইদানীং খুব বেশি মনে পড়ে। গতকালও কবর যিয়ারত করতে গিয়েছিলাম।মা আমার সাথে কথা বলেন। মন খারাপ হলে টং-এর দোকানে গিয়ে চা নিয়ে বসি। মাঝে মাঝে বৃষ্টির পর সবকিছু নির্বাক হয়ে যায়। দু একটা পাখি ডাকে।জাম গাছটার পাতায় জমে থাকা পানি টপটপ শব্দে টিনের চালায় পড়ে। আমি কান পেতে সেগুলো শুনি। দূর কোথায় আবার শোনা যায় গাড়ির হর্ণের শব্দ।ভাবি,একা একা বেড়ালে বেশ হতো। আবার এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি ভেজা পথটার দিকে। আদিগন্ত বি¯তৃত শুন্যতায় কি বিপুল বিষন্নতাই না অনুভব করি। যেন এই নিস্তব্ধ জগতের সঙ্গে আমার কোন যোগ নেই।
জানালার ওপাশ থেকে সঙ্গীরা আমায় ডাকে, একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিসঙ্গতায় ডুবছি।
তানভীর আহমেদ
নটর ডেম কলেজ

বাজারে চালের বড় দোকানটার মালিক রমজান আলীর মেজাজ ঠান্ডা স্বভাবের হলেও বাড়িতে যেদিন বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আসে, সেদিন তার মেজাজ অনেক বেশিই চড়া থাকে। হাঁড় কাঁপানো দম বন্ধ হয়ে আসার মতো শুকনো আবহাওয়াও তার সে মেজাজকে রুখতে পারেনা। ঐদিন রমজান আলীর চোখে কাজের একটু এদিক-সেদিক ধরা পড়লেই হলো, কারো রক্ষে নেই।
দোকানে এসেই আজ কয়েকটা চাল মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে পঁচিশ বছরের মানিকের গালে কষে থাপ্পড় লাগায়। মানিক ছোট সময় থেকেই এই দোকানে কাজ করে। বলা যায় রমজান আলীর মার খেয়েই সে বড় হয়েছে এখানে। মারার সময় প্রথম প্রথম অবশ্য কেঁদে ফেলতো। এখন আর কাঁদেনা সে। প্রতিদিনের অভ্যাসে যেটা পরিণত হয়,তা যতো ভয়ঙ্করই হোকনা কেন,একদিন সেটা গা সহা হয়ে যায়। তবে খুব ইচ্ছা ওর, মালিককে একদিন জব্দ করা। কারণ রমজান আলীর যতো কুকীর্তি আছে, সবই তার জানা। তাই সবসময়ই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে,কিভাবে রমজান আলীকে জব্দ করা যায়। কিন্তু মানিক কিছু করার আগেই যে সে আজ এমন কিছু দেখতে পাবে, ভাবেনি! তাই রমজান আলীকে যখন এই ভরদুপুরে বাজারের সবার সামনে শেফালি পাগলী জড়িয়ে ধরে, সেটা সে দেখেও না দেখার ভান করে উপভোগ করতে থাকে।
এদিকে রমজান আলী কোনোভাবেই শেফালি পাগলির হাত থেকে মুক্ত হতে পারছেনা। ঐ ছাড় কইতাছি, নইলে খুব খারাপ হইবো কইয়া দিলাম… ছাড়..।
-না ছাড়–মনা, আমি যহন তোরে ছাড়তে কই, তহন তো ছাড়োসনা, অহন আমিও ছাড়–মনা।ুকথাটা বলেই শেফালি রমজান আলীকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরে। এদিকে বাজারে মানুষও জমে গেছে। ঔৎসুক্য জনগন অপেক্ষায় আছে, পাগলিটা রমজান আলীর আর কি কি গোপন কথা ফাঁস করে দেয় সেটা শোনার জন্য। এমনিতেই রমজান আলীকে সবাই ভয় পায়, তাই কেউ তাকে কিছু বলতে পারেনা। ফলে মানিকের মতো বাজারের লোকজনও দাঁড়িয়ে থেকে মজা নিচ্ছে।
এই শীতের মধ্যেও শেফালির কথা শুনে রমজানের ঘাম ছুটার মতো অবস্থা।কোনোমতে বলে, কি কস এই গুলা তুই? তারপর লোকজনের দিকে তাকিয়ে জোর করে একটা হাসি টেনে বলে,পাগলরা কতো কথাই কয়, কি কন মিয়ারা?
-ঐ আমি পাগলনা, আমারে পাগল কবিনা। তোরাই আমারে পাগল করছোস! জামাই মইরা গেছেগা পরে তোরা..
চুপ কর বান্দি! অনেক সহ্য করছি, ছাড় আমারে, নইলে আজ খুবই খারাপ হইবো! শেফালিকে থামিয়ে দিয়ে রমজান রেগে গিয়ে কোনোমতে কথাগুলো বলে। কিন্তু শেফালিও থেমে নেই।
কইছিনা, তোরে ছাড়–মনা আজ! শাড়ি কিন্যা দিবি কইয়া সেইদিন কি সোহাগটাই না করলি, শাড়ি তো দিলিনা। ছেঁড়া একখান শাড়ি পইরা থাহি। আমার বুঝি শরম করেনা। শাড়ি দে আগে, তারপর ছাড়মু। শেফালির কথা শুনে রমজান আলী এবার সত্যিই ঘামতে থাকে। কারণ শেফালি তো তাকে ছাড়ছেইনা, আরও বাজার ভর্তি মানুষের সামনে তার মানসম্মান সব ডুবে যাবার অবস্থা হয়েছে। হঠাৎই মানিকের দিকে চোখ পড়লে রমজান আরও রেগে যায়, চাইয়া কি তামাশা দেখোস? খুব মজা পাইতাছোস? এইডারে ছাড়া তাত্তাড়ি! মানিক অনিচ্ছাসত্তে¡ও শেফালিকে তার মালিকের কাছ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। মানিক জোরে একটা ধাক্কা দিতেই শেফালি মাটিতে পড়ে যায়। কোনোমতে উঠে দাঁড়ায় সে। তারপর মানিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
ঐ ধাক্কা দিলি ক্যান? ধাক্কা দিলি ক্যান? ঐ তোর চামচা আমারে ধাক্কা দিলো ক্যান? রমজানকে ঝাঁকি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রমজান শেফালিকে জোরে একটা থাপ্পড় মারে। শেফালি সঙ্গে সঙ্গে কান্না জুড়ে দেয়। এদিকে রমজানের গা রাগে জ্বলছে।
ফাইজলামো করোস আমার লগে? নাটক করোস? পুংডামু কইরা বেড়াস, শাড়ি খুঁজোস? ধান্ধা কইরা বেড়াস, আবার পাগলের ভান ধরছোস? চিনোসনা আমারে! এরপর ভিড় করা লোকজনের দিকে তাকিয়ে রমজান চিৎকার করে উঠে,ঐ মিয়ারা,চাইয়া কি দেহো? পাগল কি করে, হেইডা দেইখ্যা মজা লইতাছো? সরো না ক্যান? তামশা দেইখ্যা মজা পাও? কথাটা বলে আবার যেই শেফালিকে মারতে যাবে, ওমনিই ছোটছেলে বোরহান দৌড়াতে দৌড়াতে বাজারে এসে বলে,আব্বা, তাত্তড়ি বাইত যাইন। মা মাছ কুটতে গিয়া হাত কাইট্যা ফালাইছে। কাউরে কিছু করতেও দিতাছেনা। আল্লাগো, মার যে কেমনে রক্ত গুলান পড়তাছে!
রমজান বোরহানের কথা শোনামাত্রই বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বউয়ের সঙ্গে রাগ করুক, আর যা কিছু করেই বেড়াক না কেন, বউয়ের কিছু হলে রমজান সেটা সহ্য করতে পারেনা। তোর খবর আছেু এমন শাসানো কথা যাবার আগে শেফালিকে বলে যেতে ভুল করেনা!
সবাই চলে গেলে শেফালি মাটিতে বসে নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে এবং একসময় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।প্রায় সন্ধ্যা তখন, কেরামতের লাথিতে ঘুম ভেঙে যায় শেফালির। সে কিছুই বুঝতে পারেনা। মাটিতে চুপ করে বসে থাকে। দুপুরের সে শক্তিটা তারমধ্যে আর নেই। তার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে, সেটাও যেনো শেফালি বুঝতে পারছেনা। যদি বুঝতো, তাহলে অনেককিছুই হতে পারতো।
কেরামত এখানকার এক বড় দালাল, তবে মাস্তানির জন্য লোকজন বেশি চিনে। রমজানের পর সবাই কেরামতকে ভয় পায়। কেরামতের সঙ্গে মানিকও রয়েছে। কেরামত যখন আবার লাথি দিতে যায়, তখন মানিক বলে, ওস্তাদ,লাথি দিয়োনা। ঘুম যহন ভাংছে, এরে নিয়া যাবার দায়িত্ব আমার। তুমি বরং রেডি হইয়া একবারে আইসো। কেরামত আর কিছু না বলে চলে যায়। মানিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে শেফালির দিকে। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে,পরনে একটা ছেঁড়া শাড়ি। যে শেফালি ঘোমটার আঁড়ালে লজ্জা আর সম্ভ্রম রক্ষা করে চলতো, সে শেফালির এখন শরীরের অনেকখানি জায়গা বেরিয়ে থাকলেও ভ্রুক্ষেপ নেই। বয়স বেশিনা শেফালির, খুব হলে বিশ হতে পারে এখন। মানিক কি মনে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটাসময় শেফালিকে তার ভালো লাগতো। কিন্তু সে বলার আগেই শেফালির বিয়ে হয়ে যায় তারই বন্ধু স্বপনের সঙ্গে। শেফালি দেখতে শুনতে খুব ভালো ছিল বিধায় পাড়ার মানুষ বাড়িতে খুব জ্বালাতো। ঘরে মা হীন সুন্দরী মেয়ে থাকলে গরিব বাবার মানসম্মানের চিন্তাও বেশি থাকে।তাই
তড়িঘড়ি করেই পনের বছর বয়সে তার বিয়ে দিয়ে দেয় স্বপনের সঙ্গে।বিয়ের কিছুদিন পর শেফালির বাবা মারা যায়, তারও কিছুদিন পর স্বপন! স্বামী মারা যাবার পর শেফালি ভেঙ্গে পড়ে পুরোপুরি। পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে, সে সুযোগ অনেকেই নেয়। টেনেছিঁড়ে খায় অনেকেই শেফালিকে, এখনো তা চলছে। মানিক বসে পড়ে শেফালির পাশে,
ভাত খাবি?
ভাতের কথা শুনেই শেফালি মানিকের দিকে তাকায়।
কি হইলো? খাবি ভাত? তাইলে উঠ।
শেফালি তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে, হ, ভাত খামু। খুব খিদা লাগছে।
মানিক শেফালিকে ঈশারা করে সঙ্গে যাওয়ার জন্য। যেখানটায় যাওয়ার কথা, সেখানটায় না গিয়ে মানিক ওকে দোকানের পিছনটায় নিয়ে যায়, যেখানে ও নিজে থাকে। তারপর ভাত দিলে শেফালি পেট ভরে ভাত খায়। মানিক চুপচাপ ওর ভাত খাওয়া দেখে। মোমের আগুনে শেফালির ফর্সা মুখ আরও ফর্সা দেখায়। শেফালি এখন হাসছে।
ঐ চাইয়া কি দেখোস? কথাট বলেই শেফালি আবার হাসে। হাসির সঙ্গে শেফালির শরীরও যেন নেচে উঠে। মানিকের কি হয় জানেনা, ঝাঁপিয়ে পড়ে শেফালির উপর।
ঐ কি করোস, ব্যথা লাগে তো। শেফালি গোংরানোর মতো শব্দ করে।
-চুপ কর শালি। বাজারের সব বুইড়া থাইক্যা শুরু কইরা কচি পোলাপানের লগে শুইতে পারোস, অহন তোর ব্যথা লাগে!
নেতিয়ে পড়ে শেফালির শরীরটা।
পরেরদিন মানিক রমজান আলীর হাতে আবার মার খায় দোকানে। এবার চালের জন্য নয়, শেফালির জন্য। রমজান চাপাস্বরে জিগ্যেস করে, ”কসনা ক্যান? গতকাইল যেই কাম দিলাম, হেইডা ক্যান করিস নাই? পুরনো পিরিত জাইগ্যা উঠছিল ?” মানিক চুপচাপ কথা শুনতে থাকে। কেরামত বলে, তুই কালকা শেফালিরে আনবি কইয়া আর আনোস নাই ক্যান? আর শেফালি কই আছে অহন? খুঁইজ্যা বাইর কর!
-আমি কেমনে কমু, কই আছে? কাইল আমার হাতে কামড় দিয়া দৌড়ায় গেছেগা। ধরতে পারি নাই। অহন কই আছে, কেমনে কমু কন? মানিক কথাটা বলেই আবার চুপ হয়ে যায়। সে যে গতকাল শেফালিকে গলা টিপে হত্যা করে, সেটা আর বলেনা। কারণ সে না মারলেও রমজান আর কেরামত মিলে ওকে কাল মেরে ফেলতো এবং সেটা খুব কষ্ট দিয়ে। মানিক এর আগে এমন ঘটনা অনেক দেখেছে। অসহায় মেয়েগুলির সঙ্গে কি করে এরা। কেউ কিছু বলতেও পারেনা।আইন যাদের কথায় উঠবোস করে, সেখানে আইনের নাম নেয়াই পাপ। মানিক তাই শেফালিকে ওদের হাতে বেশি কষ্ট দিয়ে মারতে চায়নি। তাই নিজেই গলাটিপে মেরে রাতের মধ্যেই তাকে মাটিতে পুতে ফেলে। কারো জানার কোনো উপায় নেই, শেফালি কোথায় আছে। কারো মাথাব্যথাও নেই। যদিও কয়েকদিন খোঁজাখুঁজি চলে গোপনে, হারিয়ে গেছে বলে নয়; নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনে। তবে একদিন সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। পাগলের খোঁজ কে রাখে?
অনেকদিন চলে যায়, হঠাৎ এক দিন উসকোখুসকো নতুন আরেক পাগলি বাজারে এসে উপস্থিত। শরীরের তুলনায় পেটটা একটু বেশিই উঁচু। যাকে দেখে, তাকেই বলে উঠছে, ঐ পেটের বাচ্চা কার? বাপ কেডা? কসনা কেরে? ঐ… বাচ্চার বাপ কেডা? তুই নি? ঐ তুইনা? ঐ… কসনা কেরে? কথাগুলো বলেই পাগলিটা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি করে কাঁদতে থাকে। কসনা কেরে… আমার যে ব্যথা লাগে। তোরা চুপ কইরা আছোস ক্যান? আমার যে কষ্ট হইতাছেরে… কথাগুলো বারবার বলেই সে মায়াকান্না কাঁদতে থাকে।
এই পাগলি, কাঁদো কেন? হঠাৎ ছোট একটা বাচ্চা ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটাকে জিগ্যেস করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে।
কি হলো? কাঁদছো কেন? তোমার কি খিদে পেয়েছে? এই নাও পতাকা।আমার কাছে তো টাকা নেই, পতাকাটা রাখো। বলেই বাচ্চাটি দৌড়ে তার মায়ের কাছে চলে যায়। মেয়েটা ছোট পতাকাটি হাতে নিয়ে বুঝার চেষ্টা করে, কি এটা। তারপর কি ভেবে বাচ্চাটা যেদিক দিয়ে গেছে, সেদিকে তাকিয়ে হাসি দেয় এবং পতাকাটা বুকের মধ্যে ধরে রাখে। ঐদিন রাতেই কয়েকজন মিলে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে রমজান আলী, মানিক, কেরামত, মাতবর সফিউদ্দিনসহ অনেকেই রয়েছে। কারণ পাগল-পাগলিদের সঙ্গে একই জায়গায় বেশিদিন সম্মান নিয়ে থাকা যায়না। কখন কি বলে ফেলে বিশ্বাস নেই ওদের।
তারও কয়েকদিন পর রাব্বি নামের বাচ্চা ছেলে একটা লাশ দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠে।
নদীর কিনারায় একটি বিধ্বস্ত লাশ পড়ে আছে, যার পেটটা ছিন্নভিন্ন ভাবে কাটা। ছেলেকে নিয়ে স্কুল শিক্ষিকা মনিরা নদীর ধারে ঘুরতে আসলে হঠাৎ’ই চোখে পড়ে লাশটা। ফলে রাব্বি দেখামাত্র ভয় পেয়ে কেঁদে উঠে। মনিরা নিজেও ভয় পায়। কিন্তু কোনো মতে নিজেকে সামলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার শুনে অনেকেই দৌড়ে আসে। ভিড়ের মধ্যেও মনিরার হঠাৎ লাশের একটা জায়গায় চোখ আটকে যায়। সে লক্ষ্য করে লাশটার বুকের কাছে বøাউজের সঙ্গে রক্তাক্ত এক পতাকা! এবং লাশটির ঠোঁটের এক কোণে হাসির একটি রেখা টানা!
মাহবুবা স্মৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সঞ্চারিণীকে দেখতে ভারী ভালো লাগছে।তার মাঝে সবে মাত্র এই বঙ্গে যে ঠান্ডা জেকে বসেছে, তা রাজধানীতে না আসলে বুঝা যেত নাহ্।এর মাঝে মাথার মধ্যে নানা রকম চিন্তা নিয়ে আরাম কেদারায় এই মিঠা রৌদ্র পোহাতে গিয়ে শেখর তার শরীরকে উষ্ণ করে নিচ্ছে । তাহলে প্রশ্ন হলো,এই সঞ্চারিণী এখানে কোথায়..? শেখর নাকি তার ভালোবাসার মানুষকে চোখ বুঝলে দেখতে পায়,এ কেমন দেখা তা আমার মাথায় আসে নাহ্।আর এ ও যে কি রকম প্রিয়তমা তাও আসে নাহ্,সম্ভবত এটা টেলিপ্যথিক প্রিয়তমা। এটা নাকি এমন জগৎ যেখানে চোখ বন্ধ করলে সব দেখা যায়,যেখানে তার ভাষ্যমতে যুক্তির পাহাড় গড়ে ওঠে,কিন্ত এসবে তো আমার মতো মানুষ যুক্তি দেখে না,তাদের মতে সেখানে নাকি প্রকৃতির নিয়মশৃঙ্খলাই প্রাধান্য পায়,সেখানে রহস্যময়তার স্পস্ট জগতের স্বীকৃতি তারা অস্বীকার ক। তবে এ কেমন প্রিয়া-বন্ধনা তা আমার মাথায় আসে নাহ্।তবে আমার বাল্যবন্ধু শেখরকে তা বুঝাতে গেলে তার দার্শনিক কথার বান দিয়ে আমার যুক্তিকে পারলে উপড়ে ফেলে দেবে।যুক্তি কেন বললাম এখন এই কথায় আসি, কারণ সত্য যা কিছু তা সব সময়ই প্রকৃতিতেই থাকে,যুক্তিই তৈরি করার বিষয়।সুতরাং, বিষয়ের ধার বুঝতে পেরে এই তর্ক আমি বেশি দূর গড়ালাম না। তবে,মহারাজ এতক্ষণে এই অধমকে ডাক দিলেন,শেখর হাক দিয়ে বলল,সাত্যকি এই দিকে আয়,’ আজকে পুষ্পকরথ (পুষ্পকরথ হলো উদ্যানের নাম,এ নিয়ে লেখতে আরেকটি সাহিত্যের ফুলছড়ী থাকা দরকার) উদ্যানে যেতে হবে…! ‘আমি বেচারা নির্বিবাদী মানুষ কিছু না বুঝে প্রশ্ন ছুড়ে বললাম, ‘কেন রে..? সঞ্চারিণীর কোন বিষয় না তো..! ‘ও বলল,’বা তেমন কিছু না….কিছুটা থেমে আবার,’বলতে গেলে প্রায় ঐ রকমই..।’তবে আমি আর কিছু বুঝি আর না বুঝি এতোদিনে এটা বুঝতে পেরেছি ছেলেটি নিজেকে যতই দার্শনিকভাব নিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করুক তার ইন্দ্রিয়ের সূতা অন্য কারোর হাতে, আর সে সেটা পুতুল খেলার মতো করে নাচাচ্ছে।অগ্যতা আমি না বলতে পেরে সায় দিলাম..। ভাবছেন,এ রকম হঠাৎ কেন হ্যা বলে দিলাম,,কারণ আমি এর আগাম ফলাফল সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানি,শেখরকে জিজ্ঞেস করলে বলবে সঞ্চারিণী সাথেই তো দেখা করতে যাব,আর তুই তো অন্য অপরিচিত কেউ না..। বাল্যবন্ধুর কিছু জিনিসের জন্য আমি ওকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারি না।তা সবেমাত্র আমাদের আলোচনায় ঠিক হলো বিকাল ৪ টায় পুষ্পকরথ উদ্যানে যাব।কথামতো আমি আমার কাজ সেরে বাড়ি থেকে বের হয়ে মিনিট খানিক হেঁটে শেখরকে নিয়ে রওনা দিলাম।যদিও তার তাড়নার সীমা অনেক হচ্ছে কিন্তু ছেলেটা কিছুতেই প্রকাশ করবেনা বলেই ভেবে নিয়েছে।ভাবতে ভাবতে উদ্যানে গিয়ে অনেকক্ষণ হেঁটে বসে পরলাম।সময় ধীরে ধীরে বওয়া শুরু করল..।অগত্যা না পেরে ওকে জিজ্ঞেস করে বসলাম,’তা তোর প্রেয়সী কি আজকে আসবে..?’মহাশয়ের জবাব ছিল,’মন বলতেছে আসবে…!’আমি হঠাৎ কিছু একটা সংশয়ের আন্দাজ করে না জিজ্ঞেস করে পারলামই নাহ্,,বললাম,’তুই ওকে আসার জন্য বলেছিস..?’শেখর অতি শান্ত-নমনীয় ভাবে বলল,’নাহ্…’শুনে প্রায় আমি ওকে ধমক দিলাম,’এ কেমন কথা শেখর,ও আসবে কিনা না আসবে সেটা না জেনেই তুই দেখা করতে চলে আসলি..’শেখর বলল, ‘আরেহ্,আমার মন বলল ও আসলে আসতে পারে,.. হঠাৎ থেমে, আর তাছাড়া ও না আসলেও সমস্যা কি..! সময় তো আর খারাপ যাচ্ছে না..।আর এখানে যে আসাই লাগবে তা তো নয়, অনুভূতিটাই থাকলেই হলো..। ‘শেখরের এইসব কথা শুনে আমার সুরের সপ্তম বিগড়ে যাবে এই অবস্থা প্রায়,,তারপরও আমি প্রায় নির্বাকই হয়ে রইলুম।ভাবলাম এইসব ফেলে হাঁটা দিই..। এই সাধুবাবার সাথে থাকলে আর কিছু হোক বা না হোক পবিত্র ভালোবাসার ভূত আমায় চেপে ধরার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আর যাই হোক নিজের এই ক্ষতি আমি কিছুতেই হতে দিতে চাই নাহ্।তবে এর মাঝে আন্দাজ করলুম এইটুকু যে এদের প্রেমের সূতা এখনো কারো হাতে পৌঁছায় নি..। তা না হলে শেখর ওতো সহজে আমাকে কথাগুলা বলতে পারতো নাহ্.. মানে এইসব… (ভাবতে ভাবতেই এক সুন্দর মিষ্টি গলার আওয়াজ কানে ভাসল), এই যে শুনো..! আমি আর শেখর বাঁ দিকে তাকালাম খানিকটা দূরে থেকেই সঞ্চারিনী ডাক দিচ্ছে, ভাবলাম এই সিনেমা বা গল্পের মতো সিনটা না হলেও চলতো।এখন আমি শেখর বলে বসলুম,’এটাও কি টেলিপ্যাথি নাকি..?’ও বলল,’কি রকম..?’ যেমন ধর বুকের বাঁ পাশে হৃদয় থাকে, আর তাই তোর সঞ্চারিণী ঐ বা দিক থেকেই আসলো না তো…! শেখর কথাটা শুনে মূহুর্তের মধ্যে মুখের হাসিমুখটা ব্যাকা করে ঘুরে তাকাতেই আমি মুখ টিপে হেসে বললুম,’না বলছি সে তো ডান দিক থেকেও আসতে পারতো, এই আরকি….’সঞ্চারিণী এতক্ষণে আমাদের কাছে চলে আসলো।এসে বলল,’তা এখন কি গোধূলি উপভোগ করা হচ্ছে..! ‘শেখর কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আমিই বলে ফেললাম,’না বৌদি, আমরাতো আসলে জোৎস্নাবিলাস করতে এসেছি.. ‘এর মধ্যে সঞ্চারিণীকে বৌদি বলে ডাকায় শেখর আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চমকে গেল.. সঞ্চারিণী অপ্রস্তুতভাব টা কিছুটা সামলিয়ে বলে ওঠল,’সাত্যকি ভালোই তো ফাজলামো শিখা হয়েছে..।আর হ্যা রে তোর জোৎস্না কি সব সময়ই আমরা সামনে আসলেই আলো ছড়ায়।এ কথা বলার কারণ, আমি উত্তর দিতে চাই না এইরকম কিছু কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি বলি এইতো জোৎস্নাবিলাস করা হচ্ছে… এতে তখন প্রশ্নের ধরনগুলাও কিছুটা পরিবর্তিত হয়।আর সঞ্চারিণীর “আমরা” বলে সম্বোধন কারণ হলো ওর সাথে গুণোধর বান্ধবী লগ্নজিতা ছিলো। শেখর বেচারা এইদিকে যেমন লজ্জা কাটাতে যথারীতি ব্যর্থ,তেমনি সঞ্চারিণীও লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। এখন এই পরিস্থিতি দু’জনে উত্তির্ন হওয়ার প্রচেষ্টা করাটাই যুক্তি সম্মত।আর যার জন্য এইসব কিছু হয়ে সেই আমি ভাবছি অন্য কথা,,এরা কি আসলে এইভাবেই দেখা করে! কোনো যোগাযোগ নাই তাও দুটো চলে আসলো..এটা কি মিথ্যা অভিনয় নাকি ভালোবাসা যার আড়ালে লুকিয়ে আছে তীব্র সুনিপন হাত যে এই খেলা দেখাতে উস্তাদ..! কিন্তু এতক্ষণে লগ্নজিতা বলে উঠল,’এই সাত্যকি তোমার এতো ইয়ে কিসের..?’আমি আবারও বললাম জোৎস্নাবিলাস করা মানুষগুলা একটু ইয়েই হয়।আর তাছাড়া তুমি কোন ইয়ের কথা বলছো..?লগ্নজিতা বলে ওঠল,’এসব ন্যাকামো ছাড়ো…বুঝেছো..। ‘আমি মনে মনে বললাম আমি আবার কই ন্যাকামো করলাম আমিতো নেহাতই আপাদমস্তক একজন বাস্তববাদী মানুষ…। এই মেয়েদের একটাই দোষ নিজের জিনিস এমন সহজভাবে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়…! আমি আর এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে উত্তর দিতে গেলাম নাহ্। আমি বন্ধু শেখরকে ওর প্রেয়সীর সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে দিয়ে সরে পরলাম। না জানি কি হয় এই প্রেমালাপে….আমার মাথায় পার্টিশন থিওরি, থ্রিপল সাসপেক্ট কোয়ান্টাম ফিনোমেন্ট ডুকলেও এই জিনিসটা ঢুকে নাহ্..। দূরে সরে গিয়ে আনমনে হয়ে আগামী অনেক প্লট নিয়ে ভাবছি, হঠাৎ দেখলাম শ্রীমতী লগ্নজিতাও ওদের রেখে আমার এদিকে আসছেন।এমনিতেই প্রেম ভালোবাসার ওপর বিশ্বাস না থাকা মানুষের পাশে এক সুন্দরী রমণী কিসব প্রলাপ বকবে ভাবতেও আমার কল্পনা বিঁধে যাচ্ছে। তবে মেয়ে হিসেবে লগ্নজিতা সুলক্ষণা,সাক্ষাৎ লক্ষীদেবী..কিন্তু রাগলে বাবা রণচী…! মনে পড়ে… হায়রে কি সাংঘাতিক ঘটনা..! এগুলো ভাবতে ভাবতে শ্রীমতী পাশে এসে দাড়িয়ে বললেন, ‘তা বাস্তববাদী কি এখনো ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন..? ‘কথাটার সুরে খোঁচা আছে যেনেও বলে উঠলাম,’তা হঠাৎ করে এই প্রশ্ন কেন..? ‘লগ্নজিতা বলল,’দেখো এদিকে বিশ্বাসের ওপর একটা পবিত্র সম্পর্ক কি সুন্দরভাবে দাড়িয়ে আছে..’আমি এবার না পেরে বলে উঠলাম, ‘এটা কি শুধু বিশ্বাস, হাসিয়ো না তো, ভরসা বিশ্বাস হলো এমন এক পাখি, যা উড়ে যাওয়ার সময় এইরকম বিশ্বাসের নামের ভালোবাসাকেও উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়, তখন দেখবে খেলার পুতুলের মতো হয়ে যাবে,যার ইচ্ছাশক্তি বেশি সেই সূতার খেলা সুনিপুণ ভাবে দেখাবে।’লগ্নজিতা বলল,’তাহলে কি শুধু বিশ্বাস সম্পর্ক ঠিকাতে পারে না.. তুমিতো বাস্তববাদী তোমার কাছে কি তাহলে বিশ্বাসের মূল্য নাই..?’আমি উত্তর দিলাম, ‘থাকবে না কেনো, কিন্তু সবকিছু বিশ্বাসের উপর হয় না..যেমন ধরো….বলা থামিয়ে আমি উদ্যানের জল বিক্রেতার কাছ থেকে জলের বোতল কিনলাম,সেটা লগ্নজিতার সামনে নিয়ে এসে সেটা থেকে মাটিতে জল ফেলে দিয়ে ওকে বললাম, তোমার দৃঢ় বিশ্বাস পারলে পারলে এই জলকে আবার বোতল বন্দি করো ঠিক আগের অবস্থায়…। ও চুপ করে রইল,আমি জানি আমি চাইলে এর উল্টে যুক্তি দেখাতে পারতাম,আর লগ্নজিতাও এর উত্তর দিতে পারতো… কিন্তু সে তো করেনি। শুধু একটি কথাই বললো,’পিছুটান যদি না থাকে তাহলে স্মৃতিমন্থনে জোৎস্নাবিলাস করো কেন…? ‘এর উত্তরও আমার জানা ছিলো কিন্তু আমিও চুপ করে রইলুম।এদিকে শীতের বিকেল প্রায় শেষ হয়ে আসছে বলে। ওরা ওদের কথা শেষ করতে করতে এসে আমাদের দিকে এগোলো,যদিও উদ্যানে অনেক পাখির তথা প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর ধ্বনির ঝংকার ছিলো,কিন্তু তাও আমার আর লগ্নজিতার মধ্যে টান টান নিরবতা ছিলো।তো আমরা বিদায় নিয়ে চলে যাব এই সময় চারজন একে অপরের সাথে ভালো মুখে বিদায় নিলেও লগ্নজিতা আমার সাথে বিদায় নেওয়ার মূহুর্তে মুখে হাসিকে ভেংচি কেটে মুখ মোড়া দিলো..!আমি কিছু না বলে শেখরকে নিয়ে এগোতে গেলাম তখন হঠাৎ মনে পড়ল ওদের বাড়ির দিকে এগিয়ে দিয়ে আসা উচিত।কিন্তু আমার দ্বারা এই বিষয়টি প্রস্তাবিত হলেও প্রেমিক পুরুষ আর প্রেমিকা একসাথে থাকায় বিপত্তি এইরকম বাঁধলো যে আমার কারণেই আমাকে আবার সেই রণচীর পাশে হাঁটতে হবে!যদিও সে পুরো পথে আগ বাড়িয়ে একটি কথাও বলেনি।তবে যাওয়ার সময় একটি প্রস্ফুটিত ফুলের মতো দীপ্তি ছড়ানো হাসিমুখ দিয়েই চলে গেল।এবার শেখরকে জিজ্ঞেস করার পালা, ‘ তোর টেলিপ্যাথি ক্ষমতাতো দেখছিরে বিশাল বিস্তর! ও বলল,’তা জানিনা, তবে উদ্যানে একবার লগ্নজিতাকে দেখতে পেয়েই ঐ কথা বলেছিলাম। কিন্তু তুইতো আবার তার কথা শুনলে…’কথাটা বলতে বলতে থামিয়ে দিলাম..। আমি বললাম,’ তা ওহে প্রেমিক পুরুষ এত্তোসব কি করলেন! ঐ প্রেম গাঁথাই তো…’শেখর বলল,’আরেহ্, বাহ্…! দাঁড়া তো আমি না হয় প্রেম গাঁথাই গাইলাম তুই লগ্নের সাথে কি কথা বললি রে..? ‘জবাব দিলাম,’ঐতো ওর বকবক, মেয়েটা যা কথা বলতে পারে না..’শেখর বললো,’আর আগে এই কথাগুলো শুনার জন্যই কতোই না আগ্রহী ছিলি, আর এখন..’ওকে থামিয়ে,’থাক,এইসব এখন বাদ দে। চল পিঠা খেয়ে আসি। বলতে বলতে দ্বিজ বিহারী স্ট্রিট বাজারের মোড়ে চলে এসে পলু দাদার দোকান থেকে বিখ্যাত ভাপা পিঠা কয়েকটা সেঁটে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে রওনা দিলাম। বাড়িতে গিয়ে এইসব মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো,সেগুলো ভুলতে চেষ্টা করলুম। অনেক চিন্তা করে মনে একটি কথা আসলো,লগ্নজিতাও দেখা যায় নিচক আবেগী নয়, হয়তো সময়ের খেলায় কিছুটা হলেও বাস্তববাদী। এসব চিন্তা যে আমার শুধু আজকে আসলো তা নাহ্।আগেও আসতো,কিন্তু আমি অনেককিছু বুঝেই সবার কাছ থেকে এসব চিন্তা দূরে সরিয়ে রাখতাম। কারণ আমার আলাদা জগতে এ লগ্নজিতা যে বড়ই বেমানান…! কিছুক্ষণ এসব চিন্তা দূর করে আমার ন্যাচারাল সাউন্ড প্রজেক্টে নিয়ে কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম।আমি প্রায়ই ভারতবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক সাউন্ড রেকর্ড করি।আর এ নিয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টীমও আছে, যারা এইরকম কাজ করতে ভালোবাসে। তাই কিছু দিনের মাঝেই প্রায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম। কিন্তু লগ্নের সামনে যাই নাই। এ প্রজেক্টের সময় আমাকে থাকতে হয়েছে গভীর অরণ্যে,উত্তাল জলপ্রপাতের পাশ ঘেষে,বা -৫ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার দেশে… তবুও আমার ঈশ্বর ও পরিবারের কথা সর্বদাই স্মরণ করেছিলুম। আর জন্য হঠাৎ বদলে যাওয়া মনে পড়তো সেই লগ্নজিতাকেও কিন্তু বলা হতো না..! এভাবেই দিনের পর দিন,এবং কয়েকমাস কেটে যায়।যখন ট্যুর শেষ করে কয়েকদিনের আমি প্রায় চলে আসবো তখনই চমকে দেওয়ার মতো নিদ্রাহীনতা থেকে উঠেই তাবুর পাশে দেখতে পাই বাল্যবন্ধু শেখরকে…! বিষয়টি দেখে এমনভাবে চমকে গেলাম, যে কি বলব…! সবশেষে একটা খুশির সংবাদ পেলুম এই ফাল্গুনের শেষে শেখর আর সঞ্চারিণীর বিয়ে..! শুনে আনন্দিত হলুম,আর আমার কথা ভুল প্রমাণিত হওয়ায়ও খুশি হলুম। আসলে ওরা কারোই সূতা খেলায় বিশ্বাসী ছিলো না,আমার মনই যত জটলা পাকিয়ে দিয়েছিলো। আর তাছাড়া বর্তমানে সুশিক্ষিত এবং স্যাটেলট্ ছেলের সাথে সঞ্চারিণীর বাবা বিয়ে দিতে যে রাজি হবেন তা আমার আগেই জানা ছিলো।আর তাছাড়া দুজন দুজনকে অসম্ভব ভালোবাসে। যাকে বলে টেলিপ্যাথিক ভালোবাসা…! এখনো আমার প্রজেক্টের কাজ কিছুদিন বাকি রয়েছে। তাও বাল্যবন্ধুর বিয়ে বলে টীমকে কাজ দিয়ে ওর সাথেই বাড়ির পথে রওনা দিলাম। অনেকদিন পরে বাড়ি যাওয়ার ভালোই অনুভূতির ছোঁয়া পেলাম।দুই বাড়িতেই বিয়ের ভরপুর আমেজ চলছে।দুজনেই আমার ছোটবেলার বন্ধু হওয়ায় আমি একলা গিয়েই সঞ্চারিণীর বাড়ি থেকেও ঢুঁ মেরে আসলাম। ওখানে অবশ্য দু একবার লগ্নজিতার সাথে মুখোমুখি হতে হয়েছে,তবুও কথা হয়নি।বিয়ের আয়োজন অনেক বড়ো। আর আমাদের সনাতনী হিন্দু পদ্ধতির বিয়ে মানে সে এক বড়ো ব্যাপার,অনেক রীতি-নীতি, নিয়ম মেনে ধর্মচর্চা করে অনুষ্ঠানাদী সম্পন্ন করতে হয়। একে একে করে অনুষ্ঠানাদী সম্পন্ন হতে লাগলো এবং ধার্যকৃত বিয়ের দিন উপস্থিত হলো।বিয়ের দিন শেখরের সাথে থাকতে হলো..সব কাজকর্ম সেরে যখন আমরা কনে বাড়ি রওনা দিলাম তখন লগ্ন মূহুর্ত পার হলেও কনের দেখা পাওয়া যাচ্ছে নাহ্..! এদিকে শুভদৃষ্টির সময় পেরিয়ে যাচ্ছে!আমি কিছুটা আচঁ করতে পেরে পরে জানতে পারলাম সঞ্চারিণী নাকি পালিয়েছে..! এ কথা আমি কোনোভাবেই মেনে পারলাম নাহ্..। আমার শুধু এখন শেখরের কথা মনে হচ্ছে! যাই ওর কাছে,গিয়ে দেখলাম বিমর্ষ হয়ে ছাঁদনাতলায় বসে আছে।মনে হয় সে ব্যাপারটা জানতে পেরেছে,আহারে..! কি হলো এইসব,আমিতো বলি মেয়েরা যে কি করে তার ঠিক নাই। এইতো কয়দিন আগে বিয়ের জন্য আয়োজন হলো, বাহিরে থেকেতো আমি ওকে খুশিই দেখলাম, তাহলে ভিতরে কি চলছিলো। এতো ভালোবাসার পরও কিভাবে আমার মিত্রটাকে ধোঁকা দিতে পারলো..আমি এদিকে শক্ত হয়ে যাওয়া ঐ মাংসল মানুষটাকে পাথরের মতো হতে দেখতেছি..! আমিও চাই না আমার কথা সত্যি হোক, তাহলে কি সেই সূতা অন্য কেউ নাচাচ্ছে!বারবার ভগবানের নিকট আকুল আবেদন করতেছি, এ যেন না-হয় ভগবান এ যেন না-হয়, এভাবে এতো মানসিক চাপ আমিও নিতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারতেছি নাহ্।হঠাৎ মায়ের ডাকের শব্দে কিছু একটা সাড়া পেলাম,, মা বললেন, ‘এ বাবা উঠ না,অনেক বেলা হয়ে যাচ্ছে যে,যা যা দেখিনি আজকে তো অনেক কাজ আছে..’আমি যেন হাফ ছেড়ে বেঁচে উঠলুম.! তাহলে এটা স্বপ্ন ছিলো, এরকম স্বপ্ন যেন কেউ না দেখে.. আর তাছাড়া অনেক নিদ্রাহীনতার ফলে এই মানসিক চাপটাই এই স্বপ্ন ঢেকে এনেছিল।যদিও আমার নেকার আত্মক ধারণার থেকে সকার আত্মক ধারণাই বেশি।এসব ভাবতে ভাবতে বাবা এসে বললেন,’কিরে বাবা তোর ঘুম কী কুম্ভকর্ণের মতো নাকি,ভাঙ্গতেই চায় নাহ্,আর এই দেখ আমি দিব্যি সকালের হাঁটা দিয়ে আসলুম।’মা বললেন, ‘কিরে কোনো কিছু স্বপ্ন দেখিছিস,,এতো অঘুমা করলেতো এমন হবেই।আর তাছাড়া দেখোনা কি রকম চুলের পাহাড় গড়েছে.. এসব করলেতো হবেই…যা যা দেখিনি…..স্নান করে শেখরের কাছে যা, ‘আমি বললাম,’আচ্ছা মা,আচ্ছা বাবা,যাচ্ছি এক্ষুনি… ‘আরও বললেন,’আর শুন শেখরের সাথে থাকিস এবং এখন খেয়ে বের হবি।’বাড়িতে থাকলে বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের যে কি আদর..এ কথা ভাবতে ভাবতেই বড়দা তার বিশাল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এলেন।তারপর কিছুসময় আমার সাথে কথা বলে ভালো ভাবে নিজের কেয়ার নিতে ও আমার খামখেয়ালির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন..। এমনিতে বড়দা হলেন এই দেশের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও দেশের খ্যাতনামা সর্বকনিষ্ঠ প্রফেসর অফ্ থিওরিটিকেল ফিজিক্স। এই একমাত্র তার নেশা, ধ্যান-ধারণা।সে যাই হোক বনেদী ঘর বলেই হয়তো এমন কান্ড। আর এগুলোর মাঝে আমি স্বপ্নের কথাও ভুলে গেলাম।যদিও লোকে বলে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়,,কিন্তু এতো ভোর নয়। যথেষ্ট পজিটিভ হয়ে পুরোপুরি কাজ সেরে বন্ধুদের সাথে একত্রিত হলাম।বিয়ে একটা অনুষ্ঠান থেকে উৎসবে পরিণত হয়েছে।যে উৎসব জীবনে একবার আসে… যেমন আমরা যখন জন্মাই তখন সবাই খুশি হয় কিন্তু আমরা বুঝি না,আবার যখন মৃত্যুবরণ করি তখন সবাই দুঃখী হয় কিন্তু জানি না।তাই এই বিয়েই জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে উৎসবের শামিল হয়।তাছাড়া পাড়া, প্রতিবেশী,পরিবার-পরিজন সবাই উপস্থিত ছিলাম। এ যেন সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার। আমি পুরো বিয়েতে ঐ স্বপ্ন নিয়ে কোনো কথা আপাততো বললাম না।বিয়ে শুরু হওয়ার আগে যখন কনে বাড়ি আসি তখন বিয়ের গেট বাঁধার প্রথার সামনে পড়তে হলো..অবশ্য শেখরের শ্যালক শ্যালিকারা টাকা আদায় করেই তবে পড়ে ছাড়ল।গেটে আসার সাথে সাথেই আমি যাকে দেখলাম সে আর কেউ নয় সে হলো লগ্নজিতা…! বিয়ের কাজে ব্যস্ত হওয়ার পরও মনে হলে সে আমার দিকে বারবার তাকিয়েই ছিলো।যাই হোক পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করতেছেন… তাছাড়া সম্পূর্ণ বিয়েই পুরো নির্ভেজালে সম্পন্ন হয়ে গেলো।কন্যাদান শেষে যখন প্রায় শেষ রাত্রি হয় নাই তখন বর কনেসহ আমরা বন্ধুবান্ধব আড্ডা দিতে বসলাম।লগ্নজিতাও সেখানে ছিলো।প্রথমে আমার আজকের গলায় ছাড়া বিখ্যাত গান ও নাচের কথা উঠল।তারপর আমাদের সবার কথা উঠা শুরু করল।আমরা একে অপরের কথা শুনে হাসতেছিলুম। তখন হঠাৎ তারক কী প্রসঙ্গ তুলে ধরলো,আর আগামীতে কার বিয়ে হবে এই বিষয় নিয়ে আবারো শুরু হলো আলোচনা।বিধু বলে ওঠল এদিকে তো দেখি মনে হয় লগ্নজিতার বিয়ে হতে পারে আর আমাদের সাত্যকির চেহারা ফুটে ওঠেছে,ওরেও বিয়ে দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।আমি ভালোভাবেই জানি এরা ইচ্ছে করেই আমার আর লগ্নজিতাকে নিয়ে স্বপ্ন তৈরি করছে..এবং এটাও জানি লগ্নজিতাই বিধুকে এটা বলতে বলছে..।আমি অন্তত সাধারণ ভাবে বললাম চেহারা ফুটে মানে কি..!ধরতে পারিস এই যা চুলগুলো একটু প্রাকৃতিকতার হিমেল হাওয়ার কিছুটা ভালো দেখাচ্ছে, আর তাছাড়া আমি পুরুষ মানুষ আমরা তো আর সুশ্রীতার পিছনে ভাগবো নাহ্..।শুনে সবাই আবার আজকে আমাকে হারাবে বলেই আমার বিরুদ্ধে উল্টোভাবে যুক্তি ছুড়তে লাগল। এতে লগ্নজিতা বাদে সবাই শামিল হলো। সে এখনো চুপ করে আছে,মাঝে মধ্যে মিটি মিটি হাসছে। এই চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। তাও সে আবার তার টানা টানা চোখ নিয়ে কিছুক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছে..।হঠাৎ আবার আমাদের সবার আগের কাটানো স্মৃতি নিয়ে কথা হচ্ছে। একে একে সবাই বলতে আরম্ভ করলো।এবার লগ্নজিতার পালা..বলতে আরম্ভ করলো,… এবং এমন এক পর্যায়ে শেষ করলো যা হলো,’……. আমি না হয় আজও ভুল ছিলাম, দোষ না হয় এখনো আমার,বিশ্বাসের পাহাড় না হয় গড়তে পারি নাই,কিন্তু যা আমার ভালোবাসা দিয়ে গড়া তার মূল্য টুকুও তো একজন দিতে পারতো..। ‘এইসব কথা এখন অন্যপ্রান্তের দ্বারে পৌঁছে গেছে,আর আমি জানি এসব সে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল,,কিন্তু আমি আর আমার অতীত নিয়ে চাই না আজ লিখতে। কিন্তু এবার আমার বলার পালা,’আমিতো আগেই স্বপ্নের পাহাড় গড়ে রেখেছিলাম,সময় হিসেবে এতটাই আমি তাকে প্রাধান্য দিয়েছি যে,সে ভুলে গিয়েছিল আমি না থাকলে কি হতো… ভুল আমারই ছিল ভালোবাসা যেমন জোর করে হয় নাহ কেমন তা জোর করে যাতানোও যায় না,ভালোবাসা শুধু নিভাতে হয়..যা এক পক্ষের কাজ নয়। সময় অনেক কিছু পাল্টায়,হে,তবে আমার ভালোবাসার মানুষ পাল্টাই নি।আমি আমার ভালোবাসার ধরন পাল্টায়েছি।আমি প্রায়সই যে সূতার কথা বলি সে সূতা থেকে মুক্ত হয়েছি…ভালোবাসাকে টকতে দেয় নি, আমি তাই তার কথা ভেবেছি,,এমনকি যখন আমি পরিবেশের প্রাকৃতিকতার সাথে মিশতে শুরু করলাম তখনও আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে আবারও নিজের মতো ভালোবেসেছি।কিন্তু সে তো আজও বলে নাই একটি কথা…… যে কি না কথায় কথায় নেগেটিভিটি খুঁজতো সে আজ আমায় পজিটিভিটির জ্ঞানের দ্বার দেখাচ্ছে! তা অবশ্য ভালো কথা, কিন্তু সে সময়ের মানুষিক ঘুরে দাড়ানোটা আমারই ছিল..আমি সেটাকে এক পাক্ষিক ভালোবাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।সে কি পারবে আজও আমার সে অপূর্ণতা হতে…?তাছাড়া কেউ কি বুঝেছে প্রাকৃতিকতার সাথে মিশে থাকা ছেলেটা কেন প্রকৃতির সব থেকে দৃঢ় সত্য ভালোবাসাকে মেনে নিতে পারে নাহ্..! আমিতো আজও বলি ভালোবাসা পবিত্র..কিন্তু অপূর্ণতা কি তা আজও পূরণ করতে পারবে..।বলার জন্যতো অনেক কথা আছে..কিন্তু যখন আমাকে বুঝার তখন এই অপূর্ণতাকেই তো আমাকে বুঝতে হবে।আমি বললাম সবাইকে ভালোবাসার পবিত্রতা যদি দেখতেই চাস তাহলে শেখর আর সঞ্চারিণীকে দেখ।এরা একে অপরকে বুঝে,যাকে আমি বলতাম টেলিপ্যাথিক ভালোবাসা….!তবে হ্যাঁ,মানুষ স্বভাবত অপাত্রে ভালোবাসা দান করলেও দুজনের প্রচেষ্টায়ই কেবল তা মধুরতম হতে পারে।এ বলে উঠলাম যে,’তোদের তো সবারই কথা শুনলাম।আর আমি নিজেও অনেক কথা বলে ফেললাম..’সবাইকে এই গুরু গম্ভীর ভাষণ দিয়ে তা সামলিয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় মূহুর্তে যখন জোৎস্না আলো ছড়াচ্ছে আবার সেই সাথে ভোরও হচ্ছে সেই নৈসর্গ্বিক মূহুর্ত দেখার জন্য সবাইকে রেখে দূরে সরে এলাম..।কিন্তু মনে হয় একজন সামলিয়ে উঠতে পারে নি,সে আর কেউ নয় লগ্নজিতা…!সেও ভোরের সময়ে পরম শান্তিময় জোৎস্নাবিলাস করতে সবার থেকে দূরে সরে খানিকটা আমার কাছে এসে দাঁড়াল। জোৎস্নার আলো সরাসরি তার মুখে পড়ায় ও ভোরের স্নিগ্ধতার জন্য তার রুপের কাছে উড়ে যাওয়া চুলের দিকে যে কেউ আঁড়চোখে তাকালে প্রেমে পড়ে যাবে। তখন এই সাত্যকি বৃত্তান্তও ফিকে পড়ে যাবে! সব মৌনতা থামিয়ে সে বলে ওঠল,’এবার না হয় আবারও সবকিছু ইতি টেনে একসাথে জোৎস্নাবিলাস দেখা হোক.. ‘আমি কিছুক্ষণ পরে বললাম,’তবে কি আবারও আমি এ হৃদয়কে খান্ডবদাহনের অনুমতি দিবো! এ সত্যতো এভাবে মানা যায় নাহ্ লগ্নজিতা! ‘লগ্ন বললো, ‘তা কেনো, বিচ্ছেদ নয়, যদি খাবদাহ হয় তাহলে দুটো হৃদয় একসাথে হোক, আর না হয় আবারও পবিত্র ভালোবাসার স্বাক্ষী হোক এই দুটো হৃদয়..।’আমি বললাম, ‘তাহলে তবে আমার অপূর্ণতা হয়েই থাকো..। ‘লগ্ন বলে ওঠল,’তাহলে তো আমি এখন সম্পূর্ণতার অপূর্ণতা..! ‘ওর এসব বাস্তববাদী কথা শুনে আমি হেসে ওঠে বললাম, ‘আমার এই জগতে অপূর্ণতাই মানানসই,কিন্তু এই লগ্নজিতা যে বড়ই বেমানান,সম্পূর্ণতার অপূর্ণতা তাহলে কিভাবে স্থায়ীত্ব পাবে…! ‘কিছুক্ষণ ওড পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মূহুর্তে আমার অপূর্ণতাই তার কাজল ভেজা চোখের শীতল মায়ায় আমার কাঁধে মাথা দিলো…তখনই মনে হয় সেই জোৎস্নাবিলাস পূর্ণতা লাভ করলো, মধুর লগ্নের শুরু হয়তো বা এর চেয়ে সুন্দর হতে পারে নাহ্।সাত্যকি বৃত্তান্ত লিখতে গেলে এই কথা আসবেই আসবে! কিন্তু আজকের এই ডাক আমি না পারতেছি ফেলতে,না পারতেছি ধরে রাখতে….? আমার নিজের কাছেও এর উত্তর নাই, প্রিয়তমাও আজ নিশ্চুপ! সাহিত্যের শেষ পাতায় হয়তোবা এভাবে শুরু হয় পথচলা, না হলে হয় বিচ্ছেদ..! কিন্ত এই বৃত্তান্তের উত্তর নাই আজও কারো কাছে,,তবে আলাদা সংস্করণ হয়েই রয়ে যাবে এই অধ্যায়..। আমি শুধু এতটুকু জানি সেই ভালোবাসার এই চিরায়ত অধ্যায়ে সে রয়ে যাবে অমলিন ভাবে, কারণ সেই যে আমার অপূর্ণতার সম্পূর্ণতা…., না হয় আমার লগ্নজিতা আজও অপূর্ণতা হয়ে রইল…!
স্বাগতম মালাকার
সরকারি বিজ্ঞান কলেজ

এ নিয়ে আটবার হলো। উঠেছে আর বসেছে। যদিও মাঘ চলে গিয়ে এখন ফাগুন মাস। তবুও পানি কি কম ঠান্ডা? শীতের আমেজটা এখনও খুব ভালো মতনই রয়ে গেছে। সন্ধ্যে হতে না হতে ঝাকিয়ে বসে পূর্ব অভ্যেস মতন। তার ওপর আবার খালের বদ্ধ পানি। হাত দিলে মনেহয় কোনো মান্ধাতা আমলের রেফ্রিজারেটরে ঢুকে গেছে হাত। কতকাল ধরে বিদ্যুৎ নেই। তবুও ভেতরে ঠান্ডা জমে জমে আস্তরণ জমে গেছে যেন। খালের পাড়ের ধান ক্ষেতগুলো এখন পুরোদস্তুর তরুণ। কৃষকের সকরুণ মমতায় বেড়ে উঠতে শুরু করেছে সবে। কবে কোন সময় ঘরে যাবে তার কোনো ঠিক নেই- যেন যাবেনা ঘরে কোন সময় এমনি ভাব মনে যেন তাদের। খালের পাড়ের একটা ধান ক্ষেতের ধারে বসেছে হারেস সেই ঘন্টা দুই আগে। এখনো উঠার কোনো নাম নেই। মনেহয় উঠতে পারবেনা আজ রাতে। রাতটা কাটাতে হবে এখানেই। রাত এখন কতদূর? জানেনা হারেস। কুহেলী ঘেরা আকাশে চাঁদ উঠেছে অনেক্ষণ আগেই। আজ কি শুক্লপক্ষ? শুক্লপক্ষ আসলে কি? – ভাবে হারেস। ‘শুক্লপক্ষ’ শব্দটার চল নেই মানুষের ব্যবহারিক জীবনে। শুধু গল্প-উপন্যাস আর কবিতার বইয়েই পড়ে এসেছে সে। কথাটা নিয়ে ভাবতে হবে একসময়। তার আগে আপদটা দূর হয়ে নিক এবার। অহ! পেটে নিদারুণ চাপ অনুভব হলো আবার। পেটের কলকব্জাগুলো যেন একসাথে নড়ে উঠে পেচিয়ে গেল একসাথে। কাইকুই শব্দ হতে লাগলো সেইসাথে। মনে হতে লাগলো কোনমতে একবার আসতে পারলেই দুই তিনটা ল্যাট্রিন অনায়াসে ভরিয়ে দিতে পারবে সে। এই শেষবার মনে করে উঠে গিয়েছিল হারেস। হেটে গিয়েছিল সামনের ধাপের কাছে- যে ধাপটা হাত তিন উঁচু হয়ে মিশেছে গিয়ে একেবারে লোকালয়ের সাথে। দৌড়ে এসে বসে আবার খালের পাড়ে হারেস। অহঃ শান্তি! নাহ, শান্তি আর হলো কোথায়! পেটের ভেতর মোচড়াচ্ছে অবিরত। সেই অনুযায়ী কাজ তো হচ্ছেনা। হাটুর নিচ দিয়ে মাথাটা কাছিমের মতো বের করে নিয়ে দেখে সে ঝাপসা অন্ধকারে। ভাবে আল্লাহ মানুষকে এই রোগটা দিলো কেন? তারচেয়ে বরং শুধু ডায়রিয়া দিলেই পারতো- কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।
শ্বশুর বাড়িতে এসেছে হারেস। এখানে আসার সপ্তাহ আগে থেকেই আমাশয় তার। এমনিতে আমাশয় তার জীবন সঙ্গী। প্রতিমাসে একবার রুটিন ধরে আসে। দুই তিন দিন থেকে চলে যায়। কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে বেশ। আজ আটদিন চলছে। যাবার কোনো নাম নেয়নি এরমধ্যে। মনেহচ্ছে মাসটা পূর্ণ করেই যাবে এবার। এখানে আসতে চাচ্ছিলো না হারেস। বউ জোরকরে ধরে নিয়ে এসেছে। আমাশয় নিয়ে কি আর কোথাও যাওয়া যায়? বোঝাতে চেয়েছিলো হারেস। কিন্তু কথা শুনেনি বউ। সে বলে এসব নাকি তার ফটকা অভিনয়। আমাশয় থাকেনা তার কোন সময়? অথচ সে বাপের বাড়িতে যায়না কত বছর ধরে! সেই কবে- কোন সময়- কত বছর আগে গিয়েছিলো একবার। এখন আর ভালো করে মনেও করতে পারেনা সেই কথা। গতবারতো বেশ দেমাগে ঝড় হয়ে গেলো একবার। তাদের ঘরের পাশে যে মোটা রেইনট্রি গাছটা আছে তা কি ভেঙ্গে পড়েছে চালার ওপর? মা কি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো ঘর থেকে? আর বাবাথ? তাঁর খোঁড়া পা’ নিয়ে কি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো ঘর থেকে? নাকি তারা থেঁতলে গেছে ঘরের ভেতর পড়ে? কিন্তু এবার আর কোনো কাল্পনিক আশংকা নিতে রাজি নয় শোফি। তাই ঝড়ের সিজন আসার আগেই একবার বাপের বাড়ি ঘুরে আসা শ্রেয় মনে করে চলে এসেছে স্বামী-কন্যাসহ।
সারাটাদিন অসহ্য যন্ত্রণা আর অস্বস্তিতে কেটেছে হারেসের। শ্বশুর বাড়ির লোকের সামনে কি আর বারেবারে ল্যাট্রিনে দৌঁড়ানো যায়? কিন্তু প্রকৃতির সাথেওবা যুদ্ধ আর কতক্ষণ? তার মনে হয়েছিলো এই পরিস্থিতির চেয়ে সে মরে গেলেই ভালো হতো। কিংবা কোনো নির্জন দ্বীপে নির্বাসনে গেলে। সন্ধ্যা হতেই সে চলে এসেছিলো এই বিলের পাড়ে। আসার সময় শোফি বলেছিলো- কই যাও?
– আজ আকাশটা খুব সুন্দর। তাইনা? একদম পরিষ্কার। একটা তারাও নেই।
– আমার কথার জবাব দিচ্ছনা কেন?
– এরকম পরিষ্কার আকাশই আমার ভালো লাগে। কোনো ঝামেলা নেই। যাবে আমার সাথে? একটু বেড়িয়ে আসি তোমাদের ঐ খালের পাড়ে। এইসময় নিশ্চয় ওখানের প্রকৃতিটা চমৎকারভাবে সেজেছে। আমি যদি কবি হতাম, তাহলে ওখানে বসে একটা মহাকাব্য রচনা করতাম। শেষবার যখন এসেছিলাম তখন খালে পানি ছিল ভরপুর। এখন যেখানে তোমাদের রসুনক্ষেত- সেখান অব্দি ছিল পানি। যাবে আমার সাথে?
– আর যাই করো। এখানে অন্তত উল্লুকের মতো কাজ করোনা।
– সামি কোথায়?
– ঘুমিয়েছে।
– খেয়েছে?
– খেয়েই ঘুমিয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো। আম্মা অপেক্ষা করবেন তাঁর জামাইরে খাওয়ানোর জন্য। তখন আব্বা বলছিলেন তোমার কথা। এসেতো একবার কথাটি পর্যন্ত বলতে গেলেনা। খোঁড়া মানুষ। তার উপর কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে বিধায় উনি আসতে পারেননি। আফসোস করছিলেন তখন। তোমারতো খোঁড়া কিংবা কোমরের ব্যথা নেই।
বেড়ে যাচ্ছে রাত। কোথা দিয়ে যে সময় চলে যাচ্ছে বুঝতে পারছেনা হারেস। এখনো সে বসেই আছে খালের পাড়ে। এরমধ্যে অসংখ্যবার উঠেছে আর বসেছে সে। ফালি চাঁদটি এখন মাথার উপরে উঠে এসেছে। কুয়াশা আর মৃদুমন্দ আঁধারে চারিদিক কেমন ঝাপসা ঝাপসা আর অশরীরী দেখাচ্ছে। এ জগতের কোন স্থান নয় যেন এটি। তেপান্তর কিংবা বহু দূরের দিকচক্রবালের রেখা দেখে যে দূর দেশের কল্পনা মানুষের মনে ভেসে ওঠে সে দেশে যেন বসে আছে হারেস। রাত্রি তার নির্জনতায় এমনি রুপ মেলে ধরে। জাগতিক টানাপোড়েনের কথা মনে থাকেনা তখন। মনে থাকেনা শারিরীক লাঞ্চণার কথা। মনে আসে ঐশ্বরিক অনুভ‚তির কথা। ব্যথা নয় তবুও ব্যথার মতো অনুভ‚তিতে ভরে যায় মন। কোনো এক দূর দেশের বন্ধুর জন্য আকুল প্রার্থনায় ব্যকুল হয় মন। মন বলে এক সময় সেখানে ছিলাম আমি। আবার যাবো সেখানে এমনি ঐশ্বরিক নিস্বর্গালোকে।
এমনি এক বছর ছয় আগের রাত্রির কথা মনে হলো হারেসের। সেদিন ছিলো এমনি রাত এমনি আমাশয়। তার ছোটবোন বকুলির বিয়ে হয়েছিলো সেই রাতে। কিন্তু সে উপস্থিত থাকতে পারেনি। শারিরীক রোগ প্রকৃতির কোলে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো তাকে। এ নিয়ে পরে তাকে কম কথা শুনতে হয়নি। বোনের বিয়ে, অথচ ভাই নেই এ কেমন বিদঘুটে কথা? যারা জানে তারা বলেছিলো আমাশয় কি আর হয়না লোকের? শ্বশুর বাড়ির লোকও অনেক গুঞ্জন তুলেছিলো। ভাইবোনে মিল নেই এ কেমন পরিবার? সেই বোন আজ আবার এসে তার ঘাড়েই বসেছে। বকুলি নাকি বন্ধ্যা। বন্ধ্যা মেয়ে দিয়ে তারা কি করবে? বৌকে দিয়ে যদি বংশই রক্ষা না হলো তাহলে এমন বৌয়ের দরকার আছে কি? গতবছর স্বামীর বাড়ি থেকে আসে সে। এসে কাঁদেনি বকুলি। তবে তার চোখমুখ ফুলেছিলো খুব। বুঝা যায় আসার আগে কেঁদেছিলো খুব। অনেক নিস্ফল আকুতি জানিয়েছিলো হয়তোবা। স্বামীর বাড়ি থেকে ফিরে আসার নয় মাস পরেই বকুলি একসাথে দুইটি কন্যা সন্তান প্রসব করে প্রমাণ করে দিলো যে সে বন্ধ্যা নয়। কিন্তু স্বামীর বাড়ির লোক এখন আরও টালবাহানা শুরু করে দিয়েছে। তিন তিনটা নারী তারা কোনলাভে প্রতিপালন করবে? হারেসদের তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচে ছোট ফারুক। সে শিক্ষিত লোক। চাকরি নিয়ে সেই যে গেল তো গেলই। আর এলোনা। লোক মারফত শুনা যায় সে নাকি বিয়ে করেছে। বাড়িতে আসার মতলব নেই। বাড়ি তো একটা চিড়িয়াখানা।
মা ও এখন বিছানায় পড়ে গেছেন। দিনরাত শুয়ে থেকে থেকে মেজাজ খিচিয়ে গেছে তার। অল্পতেই খ্যাঁকিয়ে উঠেন। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলেন। বকুলি তো দুইটা নিয়ে ব্যাস্ত থাকে সারাদিন। তার এখন আরো একজন খেদমতগার প্রয়োজন। হয়তোবা সংসারের এই নিদারুন চাপ থেকে হাফ ছাড়তেই বাপের বাড়িতে চলে এসেছে শোফি যেকোনো একটা অজুহাতে।
আকাশের চাঁদটা এখন হেলে গেছে পশ্চিমে। জোসনা ফিকে হয়ে আসেনি এখনো হেলতে শুরু করেছে শুধু। ছয়-সাতটা বাদুড় দলবেঁধে সাঁ সাঁ করে উড়ে গেল পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ বরাবর। বাদুড় তো দলবেঁধে উড়েনা। তাহলে কি এগুলো বাদুড় নয়? দেখার ভুল? আশেপাশে কোথাও আঁধারের ভেতর অদ্ভুত করুন সুরে আর্তনাদ করছে একটা ডাহুকী। একসাথে দলবেঁধে শিশুর মতো করে কেঁদে উঠে অনেকগুলো বকছানা- ওপারে আঁধারের বুকে অদৃশ্য হয়ে থাকা বিশাল শিমুল গাছটায় ডাকে ওরা অদ্ভুত ভয় জাগানিয়া সুরে। ওদিকে তাকাতে গিয়ে দেখে ওপারে খালটা বিঘা দুই জমির বেশি পাশ হবেনা, তার ওপারে আবছা ছায়ামূর্তির মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে। হ্যা, ছায়ামূর্তিই। এগিয়ে আসছে পানির দিকে ক্রমশ। ভয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায় হয় তার। ভ‚ত নয়তো? ছায়ামূর্তিটি বসে যায় ওপারে। যেভাবে বসেছে হারেস। তাহলে মানুষই হবে। হারেস ভাবে, তাহলে অই লোকটারও কি আমাশয়? পৃথিবীতে তাহলে সে একা নয় আমাশয় রোগী? আঁধার রাতে অন্য কেউ একজনও চুপিচুপি চলে আসে খালের পাড়ে। মিনিট পাঁচেক পরে ছায়ামূর্তির লোকটি উঠে যায়। লোকটি তাকে দেখে এবার। হাতে একহাত সমান লম্বা কি যেন নড়াচড়া করছে। টর্চ হবে এটা। এবার নিশ্চয় ফেলবে এদিকে। চকিতে ধান ক্ষেতের ভেতর ঢুকে যায় হারেস। সামনে থেকে একটা শেয়াল দৌড়ে চলে যায় সরসর করে। চমকে ওঠে হারেস। এটাকি তাহলে এতক্ষণ এখানেই ছিল? একখন্ড হিরের ছুরির মতো টর্চের আলো তেড়ে আসে ওপাড় থেকে। সাথেসাথে দূর হয়ে যায় আশেপাশের অন্ধকার। মাথা কি দেখা যাচ্ছে উপর দিয়ে? নাহ। তবুও নোয়ায় ভালো করে। যদিও দেখা যায় ওপাড় থেকে বুঝতে পারবেনা লোকটি। ইলেকট্রিক চার্জের আলোয় ধান গাছের মাথায় জমা হওয়া শিশির বিন্দুগিলো ঝলঝলিয়ে ওঠে। যেন দাঁত বের করে ব্যাঙ্গ করছে হারেসকে। বেশ কয়েকবার টর্চ এ মাথা ও মাথা করে অবশেষে চলে যায় লোকটি। এতক্ষণে খেয়াল হলো হারেসের। তার পরনের সাদা ধূতি লুঙ্গিটা ভিজে গেছে প্রায় শিশিরের জলে। কাদাও লেগেছে বোধহয় কোথাও কোথাও।
মোঃ সরব বাবু
সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ

আমার নাম নুরুল আমিন। দীর্ঘ সাতাশ বছর আইন ব্যবসার পর স¤প্রতি অবসর জীবনে পা রাখলাম। সবসময়ের ব্যস্ততার অভ্যাস অবসরের সাথে আমাকে কোনোভাবেই অভ্যস্ত হতে দিচ্ছিল না। হঠাৎ এ কর্মবিরতি তাই আমাকে নানা রোগব্যাধির পূর্বাভাস দিতে শুরু করল। এমতাবস্থায় হাজির হলাম আমার ডাক্তার বন্ধু আব্দুর রহমানের চেম্বারে। বন্ধু আমাকে না দিল কোনো ঔষধ, না পথ্য; বলল,বন্ধু, তোমার তো কোনো বিশেষ সমস্যা দেখছি না। আর এ বয়সে একটু-আধটু সমস্যা হয়ই। তার উপর হঠাৎ গেলে তুমি পেনশনে। আসলে হঠাৎ করে তোমার বডি ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছে না। এর কোনো ঔষধ তো নেই আমার কাছে, বন্ধু!
আমার কপালের চিন্তারেখা যেন একটু গভীরতর হলো। এটাও হয়তো বয়সেরই দোষ। আমার চিন্তা আঁচ করতে পেরে বন্ধু বলল, আরে! এতো চিন্তার কিছু নেই। আমি বলি কি, তুমি একটু দূরে একটা ট্যুর দিয়ে এসো। এতে তোমার একঘেয়েমিও দূর হবে, আবার ভালো একটা সময়ও কাটাতে পারবে। দেখবে এসব দুশ্চিন্তা, রোগ-বালাই কোথায় চলে গেছে! রহমানের কথায় কিছুটা অভয় পেলাম। তার প্রস্তাবটাও তো মন্দ না! বাড়িতে এসে সবার সাথে বসলাম ব্যাপারটা নিয়ে। সবাই প্রস্তাবে সম্মতি দিলো; কিন্তু সবারই ব্যস্ততা, কেউই সময় বের করতে পারছে না, বা চাচ্ছে না। তাই বুড়ো মানুষ আমি একাই যাব বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। একদম যে একা যাচ্ছি তা না। আমার সাথে যাচ্ছে আমাদের বাসার কাজের ছেলেটা। কাজের ছেলে বলব না; বরং বলি আমার ভাতিজা মহব্বত যাচ্ছে আমার সাথে। ‘খালুজান’ বলে ডাকে আমাকে। খুবই ভদ্র আর কর্মঠ একটা ছেলে। ও মারা যাওয়ার পর মহব্বতই তো দেখভাল করে আমার!
ছেলেমেয়েরা মিলে আমার সফরের সকল ব্যবস্থা করে দিল। আমি যাচ্ছি আমার দেশের বাড়ি, প্রায় দুই দশক পর! রওনা হবার পরদিন আমরা গ্রামে এসে পৌছালাম। বলে রাখি যে আমার বাড়ি সাতক্ষীরার এক প্রত্যন্ত এলাকায়, যার অস্তিত্ব মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া দায়; তাই নাম উল্লেখ করাটা অনাবশ্যক। অনেক দিন গ্রামের কোনো খবর নেয়া হয় নি। তবে হ্যা, শুনেছিলাম এ এলাকায় আশির দশকে একটি সরকারি গবেষণা সংস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কাজও অনেক দূর এগোয়। পরবর্তীতে সরকারবদল ও স্বায়ত্তশাসনের আমলে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অন্যত্র সংস্থাটি নিয়ে যাওয়া হয়। তাই গ্রামটিকে ঠিক
উন্নত বলা যায় না। তবে এখনও এখানে অশিক্ষিতের হারই বেশি।
মহব্বতও এ গ্রামেরই ছেলে। প্রতিবছরই ওর আসা হয় গ্রামে, তাই পথঘাট তার সব চেনা। ওর বদৌলতে গিয়ে পৌছালাম আমার বাপ-দাদার শেষ ভিটায়, আমার আসল ঠিকানায়। গ্রাম মানেই যেমন একদিকে সবুজের পাহাড় আর আকাশের বিশালতা, তেমনি আবার শাস্ত্রীয় গোড়ামির আঁকড়া আর নিয়ম-নীতির ব্যাপকতা। তা যদি হয় আবার শিক্ষাবঞ্চিত লোকে ভরা একটি গ্রাম, তবে তো কথাই নেই! তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মিললো বাড়ি পৌছানোর পরের দিনই।
যোহরের আযানের পরপরই মসজিদের মাইকে এলান পরল – ‘অমুকের ছেলে তমুক আজ সকাল এতো ঘটিকায় ইন্তেকাল করিয়াছে! ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। মরহুমের জানাজার নামাজ বাদ যোহর মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে।’ একটু খারাপ লাগলো, আসতে না আসতেই কারো জানাজা পড়তে হবে ভাবিনি। যাই হোক, আমি আর মহব্বত দু’জনই যোহর শেষে জানাজার জন্য মসজিদ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছি। আমি লক্ষ্য করলাম, মরহুমের আতœীয়-স্বজনেরা এসে জানাযায় অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু যারা যোহরের নামাজে এসেছেন তাদের কেউ জানাযায় দাড়াচ্ছে না। বরং তারা দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে! জানাযা শেষ হলো, অথচ তাদের কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। যেন আমরা কোনো অপরাধ করেছি আর তারা কোনোমতে তাদের রাগ সংযত করে দাঁড়িয়ে আছে। শেষমেশ মরহুমের আতœীয়রাই লাশ বহন করে কবরস্থান নিয়ে যেতে লাগল। আমি আর মহব্বত বাড়ি ফিরতে লাগলাম। পিছন থেকে আওয়াজ আসলো, আল্লায় অগোরে হেদায়াত দেক! আমরা এ ঘটনার মর্মোদ্ধার করতে পারলাম না।
অবশেষে আমার ভিটার কেয়ারটেকার জব্বার আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিলো।
কি ব্যাপার, জব্বার? বলো তো!
কি, স্যার?
আমরা আজকে কার জানাযা পড়েছি?
অয় হইলো বদুর পোলা।
হ্যা, তো?
অর জানাযা পড়াডা আমনেগো ঠিক অয় নাই!
কেন? কেন ঠিক হয়নি? কি সমস্যা?
অয় তো মস্ত বড় গুনাগার সিলো, পাপী সিলো এক নাম্বারের!
তাই নাকি! কি পাপ করেছিল সে?
তা জানি না, স্যার।
তাহলে?
জাফর পীরে কইসে অয় পাপী, তাই অয় পাপী।
‘পীর’ শোনার পরই ভিতরটা খচ করে উঠলো। এ গ্রামের বিদ্যাসাগর তবে এই জাফর পীর! এখন তার পুরো কাহিনী শুনতে আমি ব্যগ্র হয়ে উঠলাম।
জব্বার আমাদের জানালো যে এই জাফর পীর গ্রামের বর্ষীয়সী লোকদের মধ্যে একজন যিনি সারাজীবন ধর্মসাধনাই করে গিয়েছেন। তাই আল্লাহর সাথে নকি তার এক অদৃশ্য যোগাযোগ আছে। এ যোগাযোগের মাধ্যমেই তিনি জানতে পারেন যে এ গ্রামের প্রান্তবর্তী এলাকায় একটি পুকুর আছে। এটি কোনো সাধারণ পুকুর নয়! এর মাঝখানে যে ব্যক্তি তলদেশ পর্যন্ত সাঁতরে গিয়ে আবার জীবিত ফিরতে পারে সে-ই নাকি আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আর যে লাশ হয়ে ফিরে আসে সে হলো মহাপাপী। পীরের ব্যাখ্যামতে সে এতই বড় পাপী যে পুকুরের পানি পর্যন্ত তাকে নিজের মধ্যে রাখতে চায় না। কয়েকদিন আটকে রেখে শাস্তি দেয়, আর তারপর দেহ বিকৃত করে ভাসিয়ে দেয়। আর এ ধরনের পাপীদের জানাযা দেওয়া, পড়া ও দাফন-কাফনে অংশ নেওয়াও গর্হিত অপরাধ। আজকে আমরা যার জানাযা পড়েছি সে-ও নাকি এমনই এক পাপী। তার জানাযায় অংশ নিয়ে এখন আমরাও পাপের ভাগীদার হয়ে গেছি। কি হাস্যকর!
পুরো ঘটনা শোনার পর আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে জাফর পীর যে কত বড় পীর! পানিতে ডুবে কেউ মারা গেলে তার লাশ তো ফুলে বিকৃত হবেই – এটাই তো স্বাভাবিক। অথচ পীর বলছে পানি নাকি তাকে শাস্তি দিচ্ছে। কী আশ্চর্য! তবে একটা বিষয় এখনো ঘোলাটেই রয়ে গেলো। পানির ভিতর এদের মৃত্যু হলো কীভাবে? কী এমন আছে যা মানুষগুলোর চোখে পড়ছে না? কিসের সাহায্যে এই জাফর যাকে খুশি মেরে ফেলছে আর যাকে খুশি নি®পাপ ঘোষণা করে দিচ্ছে? পানিতে এমন কি বা কে আছে যার কারণে এভাবে জীবনগুলো চলে যাচ্ছে? কিছু তো অবশ্যই আছে। জাফর এর সবটাই জানে। আমার জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে যে জাফর আমাকে সব বলে দেবে – এটা ভাবার মতো বোকা আমি নই। তবে হ্যা, এর যে একটা সমাধা আমি করতে পারবো সেরকম একটা উদ্দীপনা পাচ্ছিলাম ভিতর থেকে। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ডাক আসছিল- এই রহস্যের উম্মোচন করতেই হয়তো আজ বিশ বছর পর আমি আবার গ্রামে এসেছি।
পরদিন সকালে আমার বন্ধু মোঃ আসাদুজ্জামানকে ফোনে স¤পূর্ণ ঘটনা খুলে বললাম। আসাদ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঘটনাটি তাকেও বেশ চিন্তিত করে তোলে। সে আমাকে আশ্বাস দেয় যে কাল-পরশুর মধ্যে সে আমার এখানে আসবে ও ব্যাপারটা খতিয়ে দেখবে। যেমন কথা, তেমন কাজ। দু’দিন পর ঢাকা থেকে আসাদ তার বিশেষ টিম নিয়ে গ্রামে এসে হাজির। বুড়ো বয়সে মানুষ যেন আবার তার শৈশবে পৌছে যায়। একটি ছোট শিশু যেমন সব কিছু জানতে চায়, বারবার প্রশ্ন করতে থাকে উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একজন বয়স্ক মানুষের মাঝেও এক পর্যায়ে সেই বিষয়গুলো ফিরে আসে। আমার আর আসাদের মাঝেও যেন সেই শিশুসুলভ কৌত‚হল কাজ করছিল, যা আমাকে ও আসাদকে এ বিষয়ে ভাবিয়ে রাখছিল প্রতিনিয়ত। আমি যে কাজে আসাদের সাহায্য চেয়েছি তা এ বোর্ডের কাজ নয়। তবুও আসাদের আন্তরিকতার কারণে আজ এক বিশাল রহস্যের খোলাসা হতে যাচ্ছে, যার ফলাফল হয়তোবা এ গ্রামের লোকদের দৃষ্টিভঙ্গি চিরকালের জন্য পরিবর্তন করে দেবে।
আসাদের টিম প্রায় ছয় ঘন্টা ধরে স¤পূর্ণ পুকুরটি তালাশ করে। সঙ্গে পুলিশ থাকায় গ্রামবাসীরা বা পীরের মুরিদরা কোনো প্রকার বাধা দিতে সাহস পায় নি। অভিযান শেষে যা সামনে এলো তা স¤পর্কে আমি, আসাদ, অভিযান টিম, পুলিশ, গ্রামবাসী – কেউই আসলে প্রস্তুত ছিলো না।
এ গ্রামে যখন গবেষণা সংস্থার কাজ শুরু হয় তখন পুকুরটির ঠিক মাঝখানে একটি গভীর ও বেশ মোটা প্রস্থের পাইপ স্থাপন করা হয়েছিল। পাইপটি একটি মোটর দ্বারা চালানোর ব্যবস্থা রাখা হয় তখন। মোটর চালু করলে পাইপ দিয়ে পুকুরের পানি সরাসরি কৃষি জমিতে পৌঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল । কিন্তু পরে যখন সংস্থাটিকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয় তখন জমির সেচের পাইপগুলো অন্য একটি উৎসের সযোগ স্থাপন করে দেয়া হয়। অপরদিকে পুকুরের ভিতরের এই পাইপটি জায়গামতো রয়েই যায়। এমনকি পাইপের উভয় প্রান্তই পুকুরের ভেতর রয়ে যায়। এ অবস্থায় মোটর চালু করলে পুকুরের পানি পাইপের মোটা মুখ দিয়ে ঢুকে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে আবার পুকুরেই পড়ে যেত। যদিও সরকার তখনই এ পাইপটি উচ্ছেদ করার আদেশ দেয় ও মোটরের সাথে পাইপের কানেকশন বিচ্ছিন্ন করতে বলে তবুও কোনো এক অজানা কারণে তা করা হয় নি। তাই যখনই কেউ পীরের আদেশে পানিতে নেমে পুকুরের মঝে গিয়ে তলদেশ পর্যন্ত ডুব দেয় তখন মোটর চালু হয়ে গেলে ঐ ব্যক্তি পাইপের মোটা মুখে খুব খারাপভাবে আটকে পড়ে এবং ধীরে ধীরে মারা যায়। কয়েকদিন পর যখন তার লাশ ফুলে-ফেপে উঠে তখন পীর বলে – আল্লাহর আদেশে পানিই তাকে শাস্তি দিয়েছে। পুরো ঘটনা জানার পর গ্রামবাসীরা তাদের এতো বছরের ভুল ধারণা বুঝতে পারে ও ভন্ড পীরকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরই সাথে তাদের চোখ ছলছল করে ওঠে তাদের জন্য, যারা এ ঘৃণ্য চক্রান্তের শিকার হয় ও নির্মম মৃত্যুর সম্মুখীন হয়।
তবে একটি জিজ্ঞাসা এখনো রয়ে যায়; জাফর এ বিষয়গুলো জানলো কীভাবে? আর মোটর কখন চালু করতে হবে আর কখন বন্ধ করতে হবে-এ বিষয়গুলোই বা সে কিভাবে জানতে পারল? এক সপ্তাহ ছুটি কাটিয়ে বাড়ি চলে এসেছি আমরা। পরের দিন সকাল সকাল আব্দুর রহমান এসেছে আমার সাথে দেখা করতে। চায়ের কাপে গ্রামের ঘটনাটি তার সাথে শেয়ার করতে করতেই ফোন বেজে উঠল। আসাদের ফোন, আজকের পত্রিকা দেখেছ? তাড়াতাড়ি দেখো এখনো না দেখে থাকলে!
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জাফর মুখ খুলে ও পুলিশকে জানায়, আশির দশকে যখন পাইপটি স্থাপন করা হয় তখন এর মোটরম্যানের দায়িত্বপালন করতাম আমি। গবেষণা সংস্থা সরানোর পর আমাকে এ পাইপটি মোটরসহ উচ্ছেদের আদেশ করা হয়। আমি তা করি নি ও মিথ্যা রিপোর্ট পেশ করি। পরে আমি চাকরি ছেড়ে দেই ও এ কাজ শুরু করি যা এতোদিন বিনাবাধায় স¤পন্ন করে যাচ্ছিলাম। আমি আমার কর্মজীবনে অনেক মামলা লড়েছি; অনেকগুলো জিতেছি, আবার অনেকগুলো হেরেছি। তবে মনে হচ্ছে আমি আমার সবচেয়ে বড় লড়াইটা জিতেছি অবসরে এসে। কারণ এ লড়াইয়ে ন্যায় পেয়েছে আমার নিজের গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো। এটাই আমার সবচেয়ে বড় জয়। যার মধ্য দিয়ে আমার গ্রামের ভয়ংকর একটি কুসংস্কারের আজ অবসান ঘটলো।
মুহম্মদ সাজিদ শাহরিয়ার শুভ্র
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি