সাধারণ মানুষের মধ্যে গল্পে গল্পে যে নাটক গড়ে উঠে, সাধারণ মানুষের গল্প অবলম্বন করে যার কাহিনী আবর্তিত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কথ্য রীতিতে যে নাটক বেঁচে থাকে তাই লোকনাট্য। নানা ধরনের জ্ঞান, শিক্ষা, ধর্ম, উপাসনা, সংগ্রাম, রাজনৈতিক চেতনা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে লোকনাট্য পরিবেশনা হয়ে থাকে।
লোকনাট্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল যুগের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে চলে। পুরাতন জীর্ণতাকে মুছে নতুন উপাদান-উপকরণের সমৃদ্ধি ঘটানো হয় নাট্যে। দর্শক যেন এক জিনিস দেখতে দেখতে আকর্ষণ হারিয়ে না ফেলে। তাই, একই আখ্যান বারবার দেখানো হলেও দর্শকের কাছে প্রতিটি আসরে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়।
কিশোরগঞ্জ জেলায় লোকনাট্যঃ এদেশের লোকনাট্য, সংস্কৃতি সমৃদ্ধ।অন্যান্য অঞ্চলের মত কিশোরগঞ্জ জেলাতেও আছে লোকনাট্যের ভাÐার। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের আদি মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর জন্মস্থান এই কিশোরগঞ্জে। যার হাত ধরে রচনা হয়েছে দস্যু কেনারামের পালা, মলচ্ছা। এছাড়া আরও রয়েছে জারি গান, সারি গান, ভাটিয়ালি, রামকীর্তন, ঘাটু গান, পালা গান ইত্যাদি।কিশোরগঞ্জের লোকনাটকের কাজ করে এমন মানুষদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম যে, সদরের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে লোকনাটক করে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। শহরে এই সংখ্যা খুব কম। তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে এই শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। তবুও তাদের নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়। তাই এইসব শিল্পের শিল্পীরা এখনো পরিবেশনা করে যাচ্ছে।বর্তমানে কিশোরগঞ্জে যে লোকনাট্য সমূহ পেয়েছি। সেগুলোর অবস্থা পূর্বক বর্ণনা করা হলঃ
১. জারি গান
২. সারি গান
৩. ঘাটু গান
৪. পালা গান
৫. রাম মঙ্গল
জারি গানঃ জারি গান বলতে বুঝায় মহররমের বিষাদের গীত। বাংলা লোকনাট্যের একটি ব্যতিক্রম পরিবেশনা। জারি অর্থ প্রচার করা এবং গান বলতে সঙ্গীত। অর্থাৎ, সঙ্গীত রীতিতে প্রচার করার মাধ্যমে এর পরিবেশনা হয়।কিশোরগঞ্জে যারা জারি গান করে, তার মধ্যে হোসেনপুর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জারি গানের দলটি সক্রিয়।
যারা পরিবেশনা করে, জনাব আল আমিন এই দলের প্রধান। দলটি ২০-২৫ জনের। সবাই এই গ্রামের আশেপাশে বসবাস করে।
তাদের পেশাঃ জনাব আল আমিন একজন রাজমিস্ত্রি। বাকিরা কেউ কৃষি কাজ করে, কেউ ব্যবসায় জড়িত,দুই-তিনজন অটো চালক,একজন রাজমিস্ত্রি।
যেসব জায়গায় পরিবেশনা হয়ঃগ্রামে বাড়ির উঠানে বা খালি জায়গা আছে, সেখানে এই অনুষ্ঠান করা হয়। এখন পর্যন্তএই দলটি দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশনা করেছে। এছাড়া, জেলা ও বাংলাদেশ শিল্পকলায় পরিবেশনা করেছে।
যে সময়ে পরিবেশনা হয়ঃ মূলত মহররমের সময়ই এই পরিবেশনা করা হয়। এছাড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ের উপর পরিবেশনা করে।
যে উপলক্ষে পরিবেশনা হয়ঃ মহররমের মহিমান্বিত ইতিহাস তুলে ধরাটা জারি গানের মূল উপলক্ষ্য। নৃত্যের মাধ্যমে এই পুরো পরিবেশনা হয়। মাঝেমধ্যে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় কাহিনীর উপরেও জারি গান করে। কিশোরগঞ্জ জেলা শিল্পকলার বার্ষিক লোকনাট্য উৎসব এবং বাংলাদেশ শিল্পকলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতি বছর অংশগ্রহণ করে।
পরিবেশনার সময় পরিধিঃ প্রায় ১ ঘণ্টার মত পরিবেশনা হয়।
বাদ্যযন্ত্র এবং প্রপস এর ব্যবহারঃ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম, কর্তাল, ঢোল ইত্যাদি এবং প্রপস হিসেবে প্রধানত থাকে লাঠি।
যে ধরণের মঞ্চ ব্যবহৃত হয়ঃসাধারণত গ্রামে খোলা-সমতল জায়গা বা এরেনা মঞ্চ করা হয়। ১০/১০ বা ১২/১২ আয়তনের মঞ্চ থাকে। পাটি,কাপড় অথবা মাদুর পেতে তার উপর কাজ করে। চতুর্ভুজ আকারের মঞ্চ থাকে। উপরে সামিয়ানা টাঙানো হয়।
যে ধরণের পোশাক পরিধান করা হয়ঃগায়ে যেকোনো ধরণের টি-শার্ট এবং পায়ে হলুদ রঙের কাবলি চোস পায়জামা থাকে। সবাই একই ধরনের পোশাক পরিধান করে পারফর্মেন্স করে।
যে ধরনের মেকআপ ব্যবহার করা হয়ঃ নরমাল পাউডার ব্যবহার করা হয় মুখের মধ্যে। মাঝেমধ্যে কিছুই ব্যবহার হয় না।
সারি গানঃ সারিবদ্ধ ভাবে একসাথে যে গান গাওয়া হয়, তাই সারি গান নামে পরিচিত। সারি শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ গমন করা।সারি গান মূলত শ্রমজীবী মানুষদের গান। ধান কাটা বা ভানা বা কায়িক শ্রমের অথবা নৌকাবাইচের সাথে এই গান চলে। কেউ বলে এটি মাটির গান। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে সোয়াইজানি নদীর তীরে লাল গোসাইয়ের আখড়া থেকে শ্রী চৈতন্য দেবের আখড়ার ঘাট পর্যন্তপ্রতি বছর নৌকাবাইচের আয়োজন হয়।
যারা পরিবেশনা করেঃ কিশোরগঞ্জের আসে-পাশে বিভিন্ন গ্রামের জোয়ান ছেলেরা এই নৌকাবাইচে অংশগ্রহণ করে।
তাদের পেশাঃ এই পরিবেশনার শিল্পীরা কেউ ব্যবসা, কেউ কৃষি, কেউ সিএনজি, কেউ মাছের ব্যবসা করে।
যেসব জায়গায় পরিবেশনা হয়ঃ সোয়াইজানি নদীর মধ্যে নৌকাবাইচের আয়োজন হয় এবং এর মাধ্যমে সারি গান করা হয়। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের এই নদীতে লাল গোঁসাইয়ের আখড়া থেকে শ্রী চৈতন্য দেবের আখড়ার ঘাট পর্যন্তজারি গান চলে।
যে সময়ে পরিবেশনা হয়ঃ মূলত প্রতি বছর ১লা ভাদ্র এই অনুষ্ঠান হয়।
যে উপলক্ষে পরিবেশনা হয়ঃ শ্রী চৈতন্য দেবের আখড়ায় একটি ঘাট তৈরি হয়েছিল। যখন চৈতন্য দেব এখানে এসেছিল। কথিত আছে যে, মনসা দেবী মানুষ রূপে এসেছিল এখানে। তাকে দেখে দুই পথিক তাকে প্রেম নিবেদন করেছিল।কিন্তু দেবী মনসা তাদের বলল যে, নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে জিতবে, তার প্রেম গ্রহণ করবে। এই ভাবে নৌকাবাইচের প্রচলন ঘটে।
পরিবেশনার সময় পরিধিঃপ্রায় এক ঘণ্টার মত পুরো অনুষ্ঠান চলে।
বাদ্যযন্ত্র এবং প্রপস এর ব্যবহারঃ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢোল, কাশী, কর্তাল ব্যবহার হয় এবং প্রপস হিসেবে নৌকার বৈঠা থাকে।
যে ধরনের মঞ্চ ব্যবহৃত হয়ঃ নৌকাকে মঞ্চ হিসেবে ধরা হয়। বিভিন্ন ধরনের নকশা এবং রং করা হয় নৌকায়।
যে ধরনের পোশাক পরিধান করা হয়ঃ সবাই একই ধরনের পোশাক পরে। লুঙ্গী ও ফতুয়া অথবা হাফ হাতা বা হাতা কাটা সাদা গেঞ্জি ব্যবহার করে।
ঘাটু গানঃএক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে গিয়ে গান পরিবেশন করা হয় বলে, এই গানকে ঘাটু গান বলে।ঘাটু গানে একটি জোয়ান ছেলেকে মেয়ে হিসেবে উপস্থিত করা হয়। এখন আর আগের মত ঘাটু গানের প্রচলন নেই। কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ঘাটু গানের লোক আছে।
যারা পরিবেশনা করেঃ নিকলীর আসে-পাশের কিছু লোক এই পরিবেশনা করে। তার মধ্যে যে একটি ছেলে থাকে। সে মেয়ে সেজে পরিবেশন করে। ৫-১০ জনের দল থাকে।
তাদের পেশাঃ তাদের কেউ ক্ষেত-খামারে কাজ করে, কেউ বাজারে সবজির ব্যবসা করে।
যে সব জায়গায় পরিবেশনা হয়ঃ গ্রাম-গঞ্জের খোলা জায়গায়,বাজারে বা বাড়ির উঠানে পরিবেশন হয়। নৌকায় হয় না বললে চলে।
যে সময়ে পরিবেশনা হয়ঃ কিশোরগঞ্জ হল ভাটির এলাকা। মূলত বর্ষাকালে জ্যৈষ্ঠ মাসে পানিথৈ থৈ করে চারদিক। এছাড়া অন্যান্য সময়ে কেউ আয়োজন করলে তখন দেখানো হয়।
যে উপলক্ষে পরিবেশনা হয়ঃ বর্ষাকালে কোন কাজ থাকে না। তখনই গ্রামের মানুষদের বিনোদনে এই অনুষ্ঠান হয়।
পরিবেশনার সময় পরিধিঃ ১ ঘণ্টাও হয় আবার ২ ঘণ্টায়, নির্দিষ্ট নেই।
বাদ্যযন্ত্র এবং প্রপস এর ব্যবহারঃ ঢোল, কাশি, কর্তাল, বেহালা, কাঠ কর্তাল, ঝুনঝুনি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র থাকে এবং লাঠি, তলোয়ার ইত্যাদি থাকে প্রপস হিসেবে।
যে ধরনের মঞ্চ ব্যবহৃত হয়ঃ একটি খোলা জায়গায় হয়। যেমন বাজার-মাঠ ইত্যাদি। ৫-৮ ফিটের মধ্যে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
যে ধরনের পোশাক পরিধান করা হয়ঃ ঘাটু গানে ছেলেকে মেয়ে সাজানো হয়। তাই ছেলেকে শাড়ি-গয়না-চুড়ি, কপালে টিপ পরানো হয়। ছেলেকে পরিপূর্ণ ভাবে মেয়ে হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
যে ধরনের মেকআপ ব্যবহার করা হয়ঃ পাউডার, লিপস্টিক, কাজল এইসব ব্যবহার করে।
পালা গানঃ পালা আকারে যে গান পরিবেশিত হয়, তাই পালা গান। কিশোরগঞ্জের নিকলীতে গণসংস্কৃতির দল নামে একটি নাট্য গ্রুপ আছে। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খাইরুল আলম বাদল। এই গ্রুপ কিশোরগঞ্জের লোকজ সংস্কৃতি সংগ্রহ করে এবং তা নতুনভাবে উপস্থাপন করে। বর্তমানে এই গ্রুপে মহুয়া সুন্দরী, রামায়ণ, দস্যু কেনারামের পালা ইত্যাদি কাহিনী গুলো হয়ে থাকে পালা আকারে।
যারা পরিবেশনা করেঃ কিশোরগঞ্জে নিকলী উপজেলায় গণসংস্কৃতির দল নামে একটি নাট্য গ্রুপআছে যা পালাগান করে। এই দলে নিয়মিত কাজ করে ১৬ জন।
তাদের পেশাঃ গ্রুপের কেউ মাঝি, কেউ কৃষক, কেউ দোকানদার, কেউ ঠেলা গাড়ির ড্রাইভার, কেউ রিকসা চালক, কেউ ইট ভাঙে।
যে সব জায়গায় পরিবেশনা হয়ঃকিশোরগঞ্জে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে, ঢাকার নানাধরনের নাট্যমঞ্চে এবং টিভিতে পরিবেশনা করেছে।
যে সময়ে পরিবেশনা হয়ঃ নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। যেকোনো সময়ে কেউ বা কোন নাট্য পরিষদ যদি আয়োজন করে। তবে তারা পরিবেশন করে।
যে উপলক্ষে পরিবেশনা হয়ঃ বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক সংঘঠন, ঢাকা বা কিশোরগঞ্জ শিল্পকলা, বিভিন্ন নাট্য গোষ্টী, পালাগান নাট্য পরিষদ ইত্যাদি যখন অনুষ্ঠান আয়োজন করে, তখন তারা পরিবেশনা করে।
পরিবেশনার সময় পরিধিঃ একেক পালার সময় একেক রকম।
বাদ্যযন্ত্র এবং প্রপস এর ব্যবহারঃ হারমোনিয়াম,ঢোল,কর্তাল,বেহালা,দোতারা,মন্দিরা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র থাকে।আর প্রপস হিসেবে যখন যে নাটকের কাহিনী উপস্থাপিত হয়।সেই অনুযায়ী প্রপসের ব্যবহার হয়।
যে ধরণের মঞ্চ ব্যবহৃত হয়ঃমূলত এরেনা মঞ্চ ব্যবহার করা হয়।মাঠে-ঘাটে,খোলা-মাঠে,বাজারে ইত্যাদি ১০/১০ ফিট জায়গায়।অন্য নাট্যমঞ্চে পরিবেশন করলে সেই অনুযায়ী মঞ্চে পরিবেশিত হয়।
যে ধরণের পোশাক পরিধান করা হয়ঃ লুঙ্গী, পায়জামা, ফতুয়া, ধুতি ইত্যাদি পোশাক পরা হয়।আবার ছেলে যখন মেয়ে সাজে তখন উড়না ব্যবহার করে।
যে ধরনের মেকআপ ব্যবহার করা হয়ঃ কেউ পাউডার ব্যবহার করে।আবার কেউ বেস মেকআপ।
রাম মঙ্গলঃরামের জীবন-কাহিনী নিয়ে যে পালা করা, তাই রাম মঙ্গল পালা।এটি এক ধরনের পালা নামক পরিবেশনারীতি। যা কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার জাফরাবাদ গ্রামে হয়।
যারা পরিবেশনা করেঃ রঘুনাথ স¤প্রদায় এই পরিবেশনা করে। এই দলের মূল গায়েন হচ্ছে গোপালচন্দ্র মোদক। ১০-১৫ জনের দল এটি।
তাদের পেশাঃ ৬ জন শিক্ষার্থী,৩ জন ব্যবসায়ীবাকিরা বাজারে কাজ করে।
যে সব জায়গায় পরিবেশনা হয়ঃকরিমগঞ্জ-জাফরাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই দলটি পরিবেশনা করেছে। এছাড়া, ঢাকার বিভিন্ন মিলনায়তন ও টিভি চ্যানেলে শো করেছে।
যে সময়ে পরিবেশনা হয়ঃ নির্দিষ্ট কোন সময় নাই। যখন কোন জায়গায় পালা অনুষ্ঠান বা ধর্মীয়-আচারের ব্যবস্থা করা হয়। তখন তারা পরিবেশন করে।
যে উপলক্ষে পরিবেশনা হয়ঃ বেশির ভাগ ধর্মীয় অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে এই পালা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বা টিভি অনুষ্ঠানে পালা হয়।
পরিবেশনার সময় পরিধিঃ ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মত পালা হয়।
বাদ্যযন্ত্র এবং প্রপস এর ব্যবহারঃ হারমোনিয়াম, ঢোল, কর্তাল, বেহালা, বাঁশি ব্যবহার করা হয়। মাঝে-মধ্যে প্রপস হিসেবে লাঠি ব্যবহার হয়।
যে ধরণের মঞ্চ ব্যবহৃত হয়ঃ এরেনা বা খোলা মঞ্চ ব্যবহার করা হয়। বাড়ির উঠানে বা খোলা জায়গায় ৮/৮ ফিটের মধ্যে পরিবেশনা করেন তারা। এছাড়া অন্যান্য জায়গায় যেরকম মঞ্চ থাকে,সেই ভাবে পরিবেশন করে।
যে ধরনের পোশাক পরিধান করা হয়ঃ হলুদ রঙের হাফ-হাতা গেঞ্জি পরে। সাথে গেরচ্ছা রঙের ধুতি এবং হলুদ উত্তরীয়।
যে ধরনের মেকআপ ব্যবহার করা হয়ঃ চন্দন, ¯েœা -ক্রিম,কাজল ব্যবহার করে।
লোকনাট্য স¤পদ একদম আমাদের নিজস্ব সৃজনশীল বিষয়। যার কারিগর এই দেশের লোকজ শিল্পীরা। জারিগানে অসা¤প্রদায়িক চেতনা রক্ষা, সারিগানের মাধ্যমে নৌকাবাইচের উৎসব, ঘাটুগানে একটা ছেলেকে মেয়ে সাজানোর অন্যরকম সৃজনশীল চিন্তা, পালাগানে একজন পালাকার দিয়ে একাধিক চরিত্রের প্রবেশ ঘটানো, রামমঙ্গল এ রামায়ণের স¤পূর্ণ কাহিনী পালা আকারে পরিবেশনা।
এগিয়ে যাক শিল্প, এগিয়ে যাক লোকনাট্য।
রেফারেন্সঃ
১) মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য-সেলিম আল দীন
২) পরিবেশনা শিল্পকলা-বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
৩) বাংলাদেশের লোকনাটক বিষয় ও আঙ্গিক বৈচির্ত্য-সাইমন জাকারিয়া
৪) খায়রুল আলম বাদল-কিশোরগঞ্জ শিল্পকলা পরিষদের প্রশিক্ষক, নিকলী জাগরণ মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
৫) হারুন আল রশিদ-সভাপতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদ
৬) জিয়াউল হক-নাট্যকর্মী, শিকড় নাট্য স¤প্রদায়, কিশোরগঞ্জ
৭) শ্রী গোপাল মোদক-মূলগায়েন, রঘুনাথ স¤প্রদায়
৮) মতিউর রহমান খোকন বয়াতী-লোকসঙ্গীত শিল্পী(পালাকার)
আবীর মোদক
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের সাথে বদলে যায় একটি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক রীতিনীতি। পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবন, মান তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। বদলে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি।এখন বিশ্বের সকল দেশই নীল অর্থনীতির দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আর এই নীল অর্থনীতির অপার আধার লুকিয়ে আছে সমুদ্রের অথই নীল জল রাশিতে।
বাংলাদেশও অন্যান্য দেশের থেকে ব্যতিক্রম নয়। আমরাও নীল অর্থনীতির দিকে বেশ অগ্রগামী। আমাদের বর্তমান সরকার নীল অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।আর এই বিষয়ে দক্ষ জনবল গড়ে তুলার লক্ষে বর্তমানে দেশের ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওশানোগ্রাফি বা সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ক ৪ বছর মেয়াদি অনার্ষ (সম্মান) এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ¯œাতকোত্তর কোর্স চালু রয়েছে।
সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বষের ছাত্রী তাসমিরা হামিদ জানায়, “সমুদ্র আমাকে বরাবরই টানে। আর এই বিষয়ে ভর্তি হয়ে আকর্ষন তো আরো বেড়ে গেছে। এই অল্প সময়ে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে আমি খুব আশাবাদি যে,এই বিষয়ে পড়ালেখা করে দেশকে অন্তত ভালো কিছু দিতে পারবো”। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত বিশেষায়িত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
যেহেতু আমি সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করছি তাই প্রথমে সমুদ্রবিজ্ঞান কি তা জানা দরকার। সমুদ্রবিজ্ঞান বা ওশানোগ্রাফি হলো সমুদ্র সম্পর্কিত জ্ঞান যা মূলত সমুদ্রের ভৌতবিজ্ঞান, জীববৈচিত্র, রসায়ন, খনিজ এবং সকল জৈব-অজৈব উপাদান নিয়ে আলোচনা করে।এছাড়াও পৃথিবীর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা করে।
সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়টা মহাসমুদ্রের মতই বিস্তর। এই বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য আপনাকে পদার্থ, রসায়ন, গনিত, জীববিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি, মৎসবিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, আইন, প্রোগ্রামিং আরো অনেকগুলো বিষয়ের সম্মুখিন হতে হবে।সমুদ্রের পরতে পরতে অজস্র রহস্য বিদ্যমান। সেই রহস্যভেদ করে তা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোই এই বিষয়ে অধ্যয়নের মূল উদ্দেশ্য। শুধুমাত্র সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বহু দেশ আজ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। বিশাল সমুদ্রসীমা থাকা সত্তে¡ও পর্যাপ্ত জনবল ও দক্ষতার অভাবে আমরা এর কোন সুফল পাচ্ছি না।
আমাদেরও সমুদ্র রয়েছে।আমরাও সমুদ্র নিয়ে ভাবি। কিন্তু তাদেও (উন্নত বিশ্বের) মত করে না। আমরা সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যাই। উপভোগ করি সাগরের ঢেউ, মৃদু হাওয়া, আর বালুকাময় সৈকতে ঘুরাঘুরির আনন্দ। দেখি দূর নীল দিগন্তে নীল জলরাশি। সমুদ্র শুধু অকূল অথৈ জলের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ নয়, এই জলের তলে রয়েছে তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান সম্পদের ভান্ডার, প্রাণীজ-অপ্রাণীজ ও নবায়নযোগ্য-অনবায়নযোগ্য অজস্র প্রাকৃতিক সম্পদের সমাহার। রয়েছে এর নানাবিধ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য্য।
১/বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ৪৭৫ ধরনের মাছ পাওয়া যায়, বর্তমানে সমুদ্র থেকে প্রায় ৬ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। এপর্যন্ত বিক্ষিপ্ত কিছু জরিপে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে মাছ ছাড়াও সামুদ্রিক শৈবাল, ৩৫ প্রজাতির চিংড়ি, ৩ প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া এবং প্রায় ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়
২/নবায়নযোগ্য সম্পদের মধ্যে কম খরচে আমরা টাইডাল এনার্জি বা সামুদ্রিক ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ পেতে পারি। সারাবিশ্বে এখন বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ চীন ও ভারতের কথা উল্লেখ করা যায়। ভারত তার উৎপাদিত ২ লাখ ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এই বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন করে, যা আমাদের জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ২ গুণেরও বেশি। চীন বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ১৫০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। একইভাবে সামুদ্রিক স্রোত এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারি।
৩/সমুদ্রের বুকে প্রাপ্ত অনবায়নযোগ্য সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উলে­খ্য তেল-গ্যাসসহ নানাবিধ খনিজ পদার্থ, যেমন—প্লেসার ডিপোজিট, ফসফরাইট ডিপোজিট, পলিমেটালিক ডিপোজিট, সালফাইড, ম্যাগানিজ নডিউলস ও ক্রাস্ট, গ্যাস হাইড্রেট, ইভাপোরাইট ইত্যাদি।
৪/আমাদের সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ প্রাকৃতিক তেল, গ্যাস বা খনিজ মজুদ রয়েছে আমরা তার সঠিক পরিসংখ্যান জানি না। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ন্যূনতম ১.৭৪ মিলিয়ন টন খনিজ বালুর সমাহার রয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে। এখানে মোট ১৭ প্রকারের খনিজ বালুর সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৮টি অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।যেমনঃ ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, লিউকোক্সিন, কিয়ানাইট, মোনাজাইট।
৫/ আমরা এই বৃহৎ প্রাকৃতিক উৎস থেকে জীবন রক্ষাকারী নানাবিধ ওষুধ পেতে পারি। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ঔষধী উপাদান সমুদ্র থেকে পাওয়া গেছে। পরবর্তী প্রজন্মের ওষুধ এই সমুদ্র থেকেই পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।
আমাদের বর্তমান সরকার সমুদ্র সম্পদের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী। আমরা ভারত ও মিয়ানমারের সাথে দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে যে বিশাল সমুদ্রসীমানা (প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার) পেয়েছি এটি তারই প্রমান। আমাদের বর্তমান সরকার তার সুদক্ষ কুটনীতির মাধ্যমে যে বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করেছে তা অধরাই থেকে যাবে যদি না আমরা এর সুষ্ঠ-সঠিক ব্যবহার ও রক্ষনাবেক্ষণ করতে পারি। ইতোমধ্যেই আমাদের অসচেতনতা ও অবহেলার কারনে আমাদের সমুদ্র সম্পদের তালিকা থেকে হারিয়ে (বিলুপ্ত) গেছে নানা সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, শৈবাল, সামুদ্রিক কচ্ছপ। এছাড়াও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রজাতির মাছ,তিমি,ডলফিন সহ অনেক সামুদ্রিক সম্পদ।
বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও টেকসই সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক গঠিত বøু-ইকোনমি সেল (বিইসি), দেশে পাবলিক মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ খোলা এবং তার পরিসর বৃদ্ধি করা, কক্সবাজারে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা, নিজস্ব ওশানোগ্রাফিক রিসার্স জাহাজ ক্রয়ের সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যা আমাদেরকে আশান্বিত করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের একটি বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। সরকার যে মহৎ উদ্দ্যেগ নিয়েছে সে গুলো বাস্তবায়িত হলেই দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
মোঃ আলমগীর হোসেন
ওশানোগ্রাফি এন্ড হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ; এক সুবিশাল ব-দ্বীপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী উজানে থেকে ভেসে আসা পলিমাটির আস্তরণে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই দেশ। যুগে যুগে রাজনৈতিক পট ও বিদেশী শাসকের পরিবর্তন অনুসারে এদেশের সংস্কৃতির ধারাও নতুন মোড় নিয়েছে; সাথে পরিবর্তন ঘটেছে এর অভ্যন্তরীণ রূপ ও অভিব্যক্তির। নানান সমঝোতা ও মিথষ্ক্রিয়ার কৌশলে টিকে থেকে প্রবাহিত হওয়া বাঙ্গালি সংস্কৃতির বিকাশের যে গতিপথ তা সত্যিই লক্ষ্যনীয়।
বাঙ্গালি সংস্কৃতির এই অভাবনীয় গতিধারায় অনেক উপাদান এখনোও পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। তার মধ্যে মনোহরী ও কৌত‚হলউদ্দীপক হিসেবে ধরা দিয়েছে প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক কাল পর্যন্তবাংলাদেশের প্রতœতাত্তি¡ক ঐতিহ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র যদি তুলে ধরা যায় তাহলে সেটি হবে অবাক করে দেবার মতো। বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ প্রতœতাত্তি¡ক স্থান রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এখন পর্যন্ত৪৫২ টি প্রতœতাত্তি¡ক স্থানের সন্ধান মিলেছে।
বাংলাদেশের প্রতœতাত্তি¡ক স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম, লালবাগের কেল্লা, শঙ্খনিধি রাজঘর, পানাম সিটি, শালবন বিহার, ময়নামতি, মহাস্থানগর, মেঘালিথিক মনুমেন্টস, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, কান্তজীরমন্দির, ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং সর্বশেষ নিদর্শন।
নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর যা কিনা দ্বিতীয় নগর সভ্যতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই সকল স্থানে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন হাতিয়ার, রক্ষাকবচ, পুঁতি, মৃৎপাত্র, সিলমোহর, স্থাপত্য ও ভাষ্কর্য, পোড়ামাটির শিল্প, শঙ্খ, বিভিন্ন ধাতব ও কাঠের শিল্পকর্ম- প্রতিটি নিদর্শনেই ফুটে উঠে প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক অনিন্দ্য ঐতিহ্যের ছাপ। সুপ্রাচীনকাল থেকে মৃৎপাত্র-নির্মাণ এক বিশেষ শিল্পকর্ম হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। প্রাচীন বাংলার ঘরে ঘরে দৈনন্দিন তৈজসপত্র হিসেবে এর ব্যবহার ছিলো। আর বর্তমানে একে মূলত শখের বস্তু হিসেবে আমরা ঘরে রাখি। নবোপলীয় স্থায়ী বসতির যুগে এর সূত্রপাত ঘটে। মানব-সভ্যতার সূচনার এক অন্যতম মাইলফলক বলা হয় এই মৃৎপাত্রকে। মহাস্থানগড়, উয়ারী-বটেশ্বর, শালবন বিহার, পাহাড়পুর, তমলুক, পাÐুরাজার ঢিবি, গোবিন্দ ভিটা, ভাসুবিহার, রাজা হরিশচন্দ্রের বাড়ি, মঙ্গলকোট প্রভৃতি প্রতœস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কিছু দু®পাপ্য মৃৎপাত্র যার মধ্যে আছে- নবযুক্ত মৃৎপাত্র, উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, রুলেটেড মৃৎপাত্র ইত্যাদি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিতা ও শিল্পকর্মের ইতিহাসে মৃৎপাত্র একটি অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হয়তো বাংলাদেশের নদীমাতৃক বৈশিষ্ট্য এবং পলিমাটির অফুরান সম্ভারের জন্যই প্রায় প্রতিটি প্রতœস্থলে এই প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শনের দেখা মেলেছে। প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শনের সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের দিক থেকে এরপর বলা যায় স্থাপত্য ও ভাষ্কর্যশিল্পের কথা। ঐতিহাসিকযুগে বাংলা স্থাপত্যশিল্পের দিক থেকে যে কতটা সমৃদ্ধ ছিলো তা বর্তমানে সংরক্ষিত মসজিদ-মন্দিরগুলো দেখলেই বোঝা যায়। প্রতœতাত্তি¡করা অনুসন্ধান করে দেখেছেন যে প্রাচীন স্থাপত্যের অধিকাংশই ধর্মীয় স্থাপত্য-স্ত‚প, মসজিদ, মন্দির, বিহার ইত্যাদি। উয়ারী বটেশ্বর অঞ্চলে লালমাটির দেয়ালে তৈরী স্থাপত্যগুলো ঐতিহ্যবাহী এবং এতে প্রযুক্তিগত উন্নতিরও চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের ইতিহাসে- জৈন মন্দির, সত্যপির ভিটা, ভোজবিহার, শালবন বিহার, রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ, নিবেদন মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, কান্তজী মন্দির ইত্যাদি অন্যতম।
ভাষ্কর্য শিল্পের কথা বললে বলা যায় যে, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার বছরব্যাপী বিকশিত ভাষ্কর্য শিল্পের আদি-পর্বের পোড়ামাটির নিদর্শনগুলো কোনো না কোনো মন্দির বা বিহারেরই অংশ ছিল। বেশিরভাগ ভাষ্কর্যই ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক তথ্য বা ধ্যান-ধারনায় সংযোজিত শিল্পীর স্বাধীন সত্তাকে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের বরেন্দ্র এলাকা থেকে সর্বাধিক ভাষ্কর্যের নিদর্শন সংগৃহীত হয়েছে। গজলক্ষী, পার্বতী, সূর্য, মঞ্জুশ্রী, অবলোকিতেশ্বর, বুদ্ধ ইত্যাদি ভাষ্কর্য শিল্প এদের মধ্যে অন্যতম। এই উপমহাদেশে মানব-সভ্যতার প্রাচীনতম শিল্পগুলোর মধ্যে আরেকটি শিল্পের প্রাণবন্তঅস্তিত্ব লক্ষ করাযায়; যার নাম পোড়ামাটির শিল্প। বাংলাদেশের অসংখ্য প্রতœস্থলও স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পোড়ামাটির নিদর্শন পাওয়া গেছে। বাংলায় মৃৎপাত্র এবং পোড়ামাটির শিল্পের প্রসারের কারন প্রায় একই- কাদামাটির সহজলভ্যতা। এই উপমহাদেশে সেই নব্যপ্র¯তরযুগ থেকেই পোড়ামাটির শিল্প পরিলক্ষিত হয়। বাংলার যে সকল প্রতœস্থলে পোড়ামাটির শিল্পের প্রাচীন নিদর্শনগুলো পাওয়া গেছে তার মধ্যে – বানগড়, মহেস্থানগড়, তমলুক,মঙ্গলকোট, চন্দ্রকেতুগড় এবং উয়ারী-বটেশ্বর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব স্থানে পাওয়া গেছে নৃত্য ভঙ্গিমায় কবন্ধ পুরুষ ভাষ্কর্য, ক্ষুদ্রাকৃতি প্রাণী, মনুষ্য নিদর্শন, পোড়ামাটির মস্তক এবং কালাতীত ধরনের নারী ভাষ্কর্য।
এই সকল পোড়ামাটির শিল্পগুলোর মধ্যে এক উচ্চমানের নান্দনিক সৌন্দর্য রয়েছে। উপমহাদেশের পোড়ামাটির শিল্প বাহ্যিক সৌন্দর্য সৃষ্টিতে নতুন চিন্তা ধারার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। বলা যায় আভিজাত্যের এক নান্দনিক ছাপ বয়ে এনেছিল। অথচ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং নির্মাতাদের অবহেলার ফলাফল হিসেবে বাংলার গর্বিত ঐতিহ্য পোড়ামাটির শিল্প বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হয়েছিল।
বাংলার প্রতœতাত্তি¡ক ইতিহাসের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী জিনিস হলো লিপিতাত্তি¡ক নিদর্শন ও সিলমোহর। প্রাচীনকালে হাতির দাঁতের ফলক, গিরিপাত্র, কাঠস্তম্ভ, পোড়ামাটি বা কাদামাটি, কচ্ছপের খোল, শঙ্খ, ছোটবড় পাথর বা ধাতব ফলকে প্রশস্তিমূলক নানা শ্লোক উৎকীর্ণ করা হতো। ব্রা²ীলিপির নিদর্শনের নাম আমরা সবাই হয়তো শুনেছি যেটি কিনা বাংলার প্রতœস্থল মহাস্থানগড়ে পাওয়া গিয়েছে। মহাস্থানগড় উৎখননে ব্রা²ী অক্ষরে একটি মৃৎশিল্পের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে যেটি কিনা আদি- ঐতিহাসিক গুপ্তপূর্বকালের বলে ধারনা করা হয়। বাংলায় যে লিপিগুলোর নিদর্শন পাওয়া গেছে তার মধ্যে গুপ্ত যুগের তাম্রশাসনের প্রাধান্য রয়েছে এবং গুপ্ত শৈলির প্রভাব ব্যাপক। গুনাইঘর তাম্রশাসন বাংলার প্রথম রাজসিক ভ‚মি-দানপত্র। প্রাচীনকালের এইসব তাম্রশাসনে গুপ্ত ঐতিহ্যের প্রতিফলন লক্ষনীয় এছাড়াও নিবিড়ভাবে স্বাধীন বঙ্গরাজ্যের সমাজ চিত্রের পরিবর্তন লক্ষনীয়। এই সকল নিদর্শন পারতই আমাদের ঐতিহ্যকে করেছে বহুগুনে সমৃদ্ধ।
এছাড়াও প্রাচীনকালে মানুষ বৈরী প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করতে যে সকল উদ্ভোদনী প্রক্রিয়ায় যানবাহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা করতো তাকেও বাংলার প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শনের সাথে লিপ্ত করা যায়। পানিপথে যাতায়াতের জন্য বজরা, পাতেলা, পাসওয়ার; স্থলপথে গরু, ঘোড়া, মহিষের গাড়ি, হাতির যান এবং সুপ্রাচীনকাল থেকেই অন্যতম প্রধান বাহন পালকি- প্রতœতাত্তি¡ক ঐতিহ্যের এক অনন্য আবেগীয় নিদর্শন। এরপর সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে মানুষ প্রস্তর নির্ভর জীবন-যাপন অতিক্রম করে তামা, লোহা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার আবিষ্কার করে। এইসময় থেকে ধাতব উপকরণের কার্যকারিতা ও ব্যবহার, তৈরী কারুশিল্প সভ্যতার ইতিহাসে বিপ্লবাত্মক ভ‚মিকা রাখতে সমর্থ হয়েছে। তামা, লোহা ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে নিত্য-ব্যবহার্য বস্তু থেকে শুরু করে বিলাস সামগ্রী, অলংকার ইত্যাদি তৈরী করা হতো। ধাতব উপকরণে তৈরী কারুশিল্প শুধু প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন নয়, বর্তমানে প্রাত্যহিক জীবনধারায় মানুষের সাথে এক অতি সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ স¤পর্ক স্থাপন করেছে। এছাড়াও প্রাচীনকাল থেকে বাংলার মানুষের কাছে সৌকর্য, আভিজাত্য ও নান্দনিকতার অভিব্যক্তি হিসেবে শুভ্র, শঙ্খ, চিত্রকলা, পটচিত্র ধারা, কাঠ খোদাই বা ছাপাই ছবি ইত্যাদি এক একটি অপ্রতিম প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন।
পারতপক্ষে বলা যায়, এই নিদর্শনগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার প্রাচীন বানিজ্য, প্রযুক্তি, সৌন্দর্যবোধ, আবেগ, অনুভ‚তি, সৃজনশীলতা ও বিশ্বাস। এই সকল নিদর্শনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ যেন সত্যিই প্রতœতাত্তি¡ক ঐতিহ্যের এক অমেয় আধার বৈশিষ্ট্যে পূর্ণতা লাভ করেছে।
নুসরাত জাহান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়

এইতো পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষা হয়ে গেলো। এসএসসিও চলছে। এসব পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে এই যে শিশু-কিশোরেরা আত্মহত্যা করছে এই ব্যাপারটা খুব অপ্রত্যাশিত ও ভয়ংকর। শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ আর সেই জায়গায় একটি শিশু দেশের উন্নয়ন করার আগেই ঝরে পরছে।বাবা-মায়ের চাপাচাপিতে দিনদিনে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটার হার আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও এরিয়ে যাওয়া যায়না। ২০১০ এ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে ৬,৫০০,০০ জন মানুষ আতœহত্যা প্রবণ। প্রতিবছর প্রায় ১০,০০০ এর উপর মানুষ আতœহত্যা করে। ২০০২ -২০০৯ সাল পর্যন্তপ্রায় ৭৩,৩৮৯ জন আতœহত্যা করেছে। কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থীরাও বাদ নেই।পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বছরে ৮৯৩৪ (৬.৭%)জন শিক্ষার্থী আতœহত্যা করে।বাংলাদেশে এত সংখ্যায় না হলেও আয়তনের দিক থেকে যথেষ্ট।
এবার শিশুদের কথায় আসা যাক। একটি শিশু পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করলে তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের বকাঝকা, মারধোর থেকে শুরু করে আতœীয়, পাশের বাসার আন্টি, ভাবিসহ নিন্দুকের কোনো অভাব থাকে না। এমন একটা অবস্থায় যখন তার মানসিক অবস্থা এমনিতেই তার মাঝে আপনার খারাপ ব্যবহার কেমন লাগবে তার! এ সময় তার মানসিক স্বাস্থ্য এতটা বিগড়ানো অসম্ভব নয় যাতে সে সুইসাইড এটে¤পট করে।
বয়ঃসন্ধিৎসু দের বিভিন্ন পরিবর্তন তাদের মাঝে এমনিতেই অনেক প্রভাব ফেলে। তারা এসময় নিজেকে নতুনভাবে জানতে শেখে। অনেক টানাপড়েন চলতে থাকে। বাংলাদেশে তথাকথিত সেক্স এডুকেশনও শুধু নামকরা স্কুলগুলোর জন্যই প্রযোজ্য। সে প্রসংগে নাই এলাম। এ সময় তাকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়াটাও জরুরি। কিন্তু সে তো শিক্ষার নামে কেবল ওই টেক্সটবুক গুলোই চেনে।যখন এসএসসি পাশ করলাম আমার এক সহপাঠী ছিল যে এসএসসি তে সায়েন্স নেয়ার মত আশানুরূপ ফল করল না। প্রসংগত সে আর্টসে আগ্রহী ছিল।তার শিক্ষিত মা তাকে ইয়ার লস দিয়ে আবার একটি স্কুলে সায়েন্সে ভর্তি করল তাও উপরি দিয়ে।
অনেক বাবা-মা তো এমনও আছেন যাদের ছেলেমেয়ে ১০০ তে ৯৯ পেলেও তারা ঐ ১ মার্কের জন্য অখুশি। সেকেন্ড ফেইস হলে তাদের ফার্স্ট চাই। প্রতিযোগিতাটা যেন তাদেরই। এর ফাঁদে পরে অনেক ছেলেমেয়ে আতœহত্যা করছে। যারা করছে না তারা একটি ডিপ্রেশনে ভুগা, সেল্ফ কনফিডেন্সহীন প্রজন্ম হিসেবে গড়ে উঠছে। তাদের মোটিভেশান এর দরকার হচ্ছে না, হলে তারা বড় হয়েও আতœহত্যা প্রবণ হয়ে উঠছে। এমন প্রজন্মআর যাই হোক মানবস¤পদ হতে পারে না।
মায়েরা শৈশবে ছড়া-কবিতা না শুনিয়ে তাদেরকে বইয়ের অনেক ভার চাপিয়ে দিচ্ছে আর ছেড়ে দিচ্ছে সমুদ্রের অতল স্রোতে। তাদের ইচ্ছেগুলোকে না বুঝে খালি ফার্স্ট হওয়ার কথা বলছে। মানুষ হওয়াটা যে অধিক জরুরি সেটা তারা বুঝছে না। পরিবার, শিক্ষক ও আশেপাশের মানুষের একটু পাশে থাকা যেখানে নিঃসন্দেহে তাকে আবার ইন্সপাইয়ার করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
(সুত্র-শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, দি ডেইলি স্টার, বিএসএএফ,এনসিআরবি ইন্ডিয়া)
সাদমান হাশিম
শহীদ এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান সরকারি ডিগ্রি কলেজ

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সাধারণ মানুষের মতোই মানুষ। আমাদের মতো খাওয়া-দাওয়া, ভরণ- পোষণ, চলা-ফেরা, আনন্দ-উল্লাস, কাজ-কর্ম সব-ই করে। আছে তাদের চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু পার্থক্য শুধু এখানেই- হয়তো কারো হাত নেই কারো পা নেই কেউ কথা বলতে পারেনা কেউ শুনতে পায় না কেউ চলাফেরা করতে পারেনা আবার কেউ কাজ করতে পারেনা কেউবা দৃষ্টিহীনতার কারণে পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেনা। এদের কেউ দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া নানা দুর্ঘটনায় নিজের অঙ্গ হারায় আবার কেউ জন্মগতভাবে স্রষ্টার কাছ থেকে প্রতিবন্ধী সনদ নিয়ে ধরায় আগমন করে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ০৭ ভাগ। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ৯৪ ভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। সর্বশেষ সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৫৮০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে এবং এটি চলমান প্রক্রিয়া বলে জানা গেছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে একটি রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই এদের অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত ও সুরক্ষা আইন প্রচ্ছন করেন। ২২ নভেম্বর ২০১৫ সালে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করেন। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব হওয়ার পরেও সঠিক কাউন্সিলিং ও কার্যকারিতা না থাকায় অধিকাংশ প্রতিবন্ধী এখনো অধিকার বঞ্চিত। এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তৃনমুল পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব- সহায়ক দল ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডিপিও) গঠনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার স¤পর্কে সচেতন করা , দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলে উন্নয়ন কর্মকাÐে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের কাজ চলছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক ৩ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প ২০১৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন করছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে বর্তমান সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের প্রতিবন্ধীবান্ধব নীতির কারণে কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছে। ধারণা করা হয়, এখন মাঠপর্যায়ে কাজ করলে উদ্যোগ পরিপূর্ণভাবে সফল হবে। রাষ্ট্র এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ধারণা ও পলিসিগত পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে এর সঠিক প্রয়োগ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বর্তমান অবস্থা ও উন্নয়নের কথা তুলে ধরে সবর্ণ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে ‘এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেনুবর্তমান সময়ে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন, এটাই হলো বড় প্রাপ্তি। তাদের নানান জায়গায় প্রবেশগম্যতার বিষয়টি মূখ্য করে দেখতে হবে। সরকার জাতীয় পরিকল্পনা করেছে আমাদের দায়িত্ব এটি সকলের নিকট পৌঁছে দেওয়া। জাতিসংঘ ঘোষিত সনদ, জাতীয় আইন এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা- এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে ভ‚মিকা রাখতে হবে।
সা¤প্রতিক আমার নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউপি সদস্য ‘সুবর্ণ নাগরিক’ শিল্পী বিশ্বাস বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে স্থানীয় সরকার। এই জন্য স্থানীয় সরকারের ১৩ টি স্থায়ী কমিটিতে অন্তত একজন প্রতিবন্ধী প্রতিনিধি রাখা প্রয়োজন। তিনি আরোওজানান, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সুবর্ণ নাগরিকদের উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত বিভিন্ন কমিটিতে যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকলেও তাদের কমিটিতে রাখা হয়না।এই জন্য আমরা আমাদের অধিকার সুরক্ষায় নিশ্চিত না।
বর্তমান সময়ের অধিকার বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবর্ণ নাগরিকরা এখন আর আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়না তারা এর সুষ্ঠু কাউন্সিলিং ও কার্যকারিতা চায়। দেশের সকল শ্রেণীর নাগরিকের উচিত এদেরকে সমতার চোখে দেখা।সবাই সবার জায়গা থেকে এগিয়ে আসা।সাধারণ নাগরিকদের উচিত সুবর্ণ নাগরিকের সাথে ভালো ব্যবহার, সেবা এবং করুণা দিয়ে সাহায্য করা। বৈষম্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোন কাজ না করা। সর্বস্তরের মানুষ তাদেরকে সমতার চোখে দেখুক এটা তাদের প্রত্যাশা। যানবাহন থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ততাদের জন্য সমতার গান গাওয়া হোক এমনটি সকলের কামনা।
আমাদের আইনি কাঠামো, জাতিসংঘ সনদ- সব আছে। নেই শুধু প্রয়োগ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন খাতে সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের প্রবেশগম্যতার জায়গাটি আরও প্রশস্ত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যতই সেবাধর্মী উদ্যোগ নেওয়া হোক, সেগুলো তাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভ‚মিকা রাখবে না, যতক্ষণ না সবখানে তাদের প্রবেশগম্যতা সুগম হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো সুযোগ না পাওয়ার কারণে মাঝপথে কিংবা শুরুতেই ঝরে পড়ে। 
শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের যুগোপযোগী পরিবর্তন ছাড়া অধিকার বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ এই মহলকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শুধু সেবা বা করুণা নয় , প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি,এনজিও ও সামাজিক সংগঠন গুলোকে আরো আন্তরিক ও দায়িত্বশীল আচরণের দিক থেকে এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়াকেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে থাকতে হবে, তাহলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং তাদের অধিকার আদায়ে সবাই সচেতন হবে।আর এভাবেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা করুণা ও সেবার পাশাপাশি তাদের অধিকার নিশ্চিত করে পৃথিবীর বুকে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার,প্রবেশগম্যতা তথা নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে সর্বত্রে চলাচল সর্বোপরি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের ও জনগণকে এগিয়ে আসার আহŸান থাকবে।
আব্দুজ জাহের নিশাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সমাজ বিনির্মাণ ও পরিবর্তনে চাই নেতৃত্বের চর্চা

নেতার গুনই নেতৃত্ব। কোন কাজকে সফল করতে হলে, নেতৃত্ব হতে হবে সুষ্ঠ। নেতৃত্বের কারণেই অনেক অসাধ্যকে সাধন করা যায়, অনেক ক্ষতির সম্মুখীন থেকেও নেতৃত্ব গুনেই টিকে থাকা যায়। নেতৃত্ব একটি শিল্প। সঠিক নেতৃত্বের প্রভাবে একটি পরিবার, প্রতিষ্ঠান, দেশ এমনকি বিশ্বও বদলে যেতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাস আসলে নেতৃত্বের ইতিহাস। একজন যোগ্য নেতাও ও তাঁর নেতৃত্বের হাত ধরে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম হতে পারে, শুরু হতে পারে নতুন যুগ। সৎ, যোগ্য, সাহসী এবং সহানুভ‚তিশীল নেতৃত্বের জন্য নেতৃত্ব চর্চার বিকল্প নেই।
নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতি, দেশ এমনকি কোনো সংগঠনও চলতে পারে না। জাতির উত্থান পতন অনেকাংশে নির্ভর করে নেতৃত্বের ওপর। দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবারসহ সকল স্থানে সঠিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। একটা পরিবারে যদি সঠিক নেতৃত্ব না থাকে তাহলে সে পরিবারে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে না। সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সমাজেও তাই নেতৃত্বের অভাবে হানাহানি, মারামারি, সহিংসতা দেখা দেয়। যেকোনো দেশেও তেমনি নেতৃত্বের অভাবে উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের গুরুত্ব রয়েছে। আমরা যারা সমাজ বিনির্মাণ এবং পরিবর্তন করতে চায় তারা সমাজে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বা ঈৎবফরনরষরঃু অর্জন করতে অনেক পিছনে পড়ে আছি। এ জন্য সবচেয়ে বড় অভাব হচ্ছে একজন সুযোগ্য ও দূরদৃষ্টি সুস¤পন্ন দক্ষ নেতৃত্বের।
নেতৃত্ব একটি চর্চার বিষয়। আমাদের ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের চর্চা করা উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং লিডারশিপ ট্রেনিং গুলোতে যোগদানের মাধ্যমে আমরা নেতৃত্বের চর্চা করতে পারি। দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখতে চাইলে নেতৃত্ব চর্চার কোনো বিকল্প নেই। নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, আব্রাহাম লিংকন, মহত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান ও স্টিভ জবসের জীবনী থেকে জানা যায় তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী ফুটে উঠেছিল তাদের সমাজ ও সমাজের মানুষের কল্যাণের জন্য ভাবনার ফসল হিসেবেই। সমাজের বিদ্যমান সমস্যাগুলো তারা বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী তারা মানুষকে সেই সমস্যা সমাধানে কাজ করতে একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তাই আমাদের প্রতিনিয়ত নেতৃত্বের বিকাশ সাধন ও চর্চায় মনোযোগ দেওয়া উচিত।
নেতৃত্ব অর্জন করতে হলে বা নেতৃত্ব দিতে হলে নেতৃত্বের গুন গুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে। নেতৃত্বের গুন স¤পর্কে সান জু বলেন, নেতৃত্ব হল বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবিকতা, সাহস, ও শৃঙ্খলাবোধের বিষয়। যার মধ্যে এই গুন গুলোর সমন্বয় ঘটবে, তার মধ্যে সঠিক নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। তাছাড়াও দূরদৃষ্টি, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ধৈর্য ধারণ ক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা, সময়নিষ্ঠ ও বিনয়ী হওয়া ইত্যাদি গুণাবলী নেতৃত্বের জন্য অতীব প্রয়োজন। একজন সফল নেতার দায়িত্ব হচ্ছে তার অনুসারীদেরকে শুধু অনুপ্রেরিত ও পরিচালিত বা তাদের দিয়ে কাজ করানোই নয় বরং তার অনুসারীদের মাঝ থেকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেয়ার মত যোগ্যতা অর্জনের প্রতিভার অন্বেষণ ও প্রশিক্ষণ। কেউ জন্ম থেকে এসব গুণাবলি নিয়ে পৃথিবীতে আসেনা, সবই চেষ্টা এবং চর্চার ফসল।
লিঙ্কন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এন মেরি ই. ম্যাকসোয়েনের মতে, নেতৃত্ব আসলে ক্ষমতা: নেতাদের শোনার ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা, সব স্তরের সিদ্ধান্তনেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনা শুরু করায় উৎসাহদানের জন্য নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা, সিদ্ধান্তনেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা, জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের মূল্যবোধ ও দূরদর্শিতাকে ¯পষ্টভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা।
সমাজ বিনির্মাণ ও পরিবর্তনের প্রথম শর্ত সঠিক নেতৃত্ব। সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বের গুণে এগিয়ে যেতে পারে সমাজ ও দেশ। নেতৃত্বহীনতায় পড়ে গেলে, পথ হারাবে বাংলাদেশ। তাই আমাদের সবার অবস্থান থেকে সুষ্ঠ নেতৃত্বের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে যে কোন সংকটে আমরা সফল হতে পারি।অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য সব কিছুতে যোগ্য নেতৃত্ব এখন সময়ের দাবি। দেশের প্রশাসন আর রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গেরও প্রয়াস চালাতে হবে, যাতে যোগ্য নেতৃত্ব ওঠে আসে। নেতৃত্বের চর্চা আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।
আমজাদ হোসেন
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি”। আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আজকের দিনটি বাঙ্গালি জাতির জীবনে অবিস্মরণীয় ও চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে। এই দিবস আজ শুধু বাঙ্গালীর প্রাণের দিবস না, এটি সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি জাতির, প্রতিটি জাতিসত্তার প্রাণের দিবস।
আজকের এই দিবসের যেমন ব্যাপক তাৎপর্য বিদ্যমান তেমনি আজকের দিনের রয়েছে সুবিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাস কম বেশি আমাদের সকলেরই জানা। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, পাকিস্তান-ভারত স্বাধীনতার সূচনা লগ্ন থেকেই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে নিজেদেরকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রবনতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। নিজেদের মধ্যে কেউ যখন একে অপরের উপর কতৃত্ব পরায়ন হয়ে উঠে আর তখনি শুরু হয় বিভেদ-বৈষ্যম্য। আমাদের ভাগ্যেও তাই হয়েছিল।
পাকিস্তানিরা তাদের নিজেদের মুখের ভাষাকে এক তরফা ভাবে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে, সম্পূর্ণ জাতির মধ্যে ঐক্য ও বিশ্বাসের মধ্যে চির ধওে ছিল। আর সেই অবিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়ে ছিল এক একটি কালো অধ্যয়। ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ তেমনি একটি ইতিহাসের ভয়ংকরতম একটি কালো অধ্যায় জন্ম দিয়ে ছিলো। যার স্বীকার হয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর জব্বাররা।
তাঁদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা, মায়ের ভাষা। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা সেদিন ঘটেছিল, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একুশের প্রথম প্রহর থেকেই জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে আসছে। সকলের কণ্ঠে বাজে একুশের অমর শোকসঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…।’

একুশের চেতনা আমাদের আত্মমর্যাদাশীল করেছে। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ চিরকালের এ শ্লোগান তাই আজও সমহিমায় ভাস্বর। একুশ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যাবতীয় গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে শুভবোধের অঙ্গীকার। বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি বসন্তের বাতাস ও পলাশ রঙে রাঙানো প্রভাতের সূর্য অমিত সম্ভাবনার যে স্বপ্ন, যে প্রত্যয় জাতির হৃদয়ে বপন হয়েছিল, সেই তেজোদীপ্ত বিদ্রোহের সুর আজো প্রতিটি ক্রান্তিকালে ধ্বনিত হয় বাঙালির হৃদয়ে। একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রীয় ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে, খালি পায়ে শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-বনিতা সবাই শামিল হতে শুরু করে শহীদবেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। শুধু ঢাকাতেই নয়, সারাদেশের স্কুল-কলেজ, জেলা ও থানা প্রশাসনের উদ্যোগে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
শোকবিহŸলতা, বেদনা আর আত্মত্যাগের অহংকারে দেদীপ্যমান ভাষা আন্দোলনের সেই শপথ যুগে যুগে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আলোকবর্তিকার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে। এখনো জাতির যে কোন ক্রান্তিকালে ভাষা আন্দোলন আমাদের প্রেরণা যোগায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা আন্দোলন জাতির বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরে। যখন স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ এগিয়ে চলেছে, ধর্মান্ধ মৌলবাদী মানবতাবিরোধী অপশক্তি যখন দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডল অস্থির অশান্ত করে তোলার চক্রান্তে লিপ্ত তখন চির প্রেরণার প্রতীক অমর একুশে নতুন তাৎপর্য নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছে। তাই আজ শুধু শোক নয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করার দিন।
১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতাকারী পাকিস্তানসহ জাতিসংঘের সবগুলো দেশ ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
শুধু কি তাই? আমাদের আরো গৌরব ও মর্যাদার কথা হলো আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সেদেশের জনগণ বাংলাভাষা শিক্ষা গ্রহন করছে। জাপান ও অষ্ট্রেলিয়ায় নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। জাতিসংঘের অনেক সংস্থার কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষা শিখতে হচ্ছে।
বর্তমান প্রচার মাধ্যম রেডিও, টেলিভিশন, ও ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, জার্মানী, চীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদিআরব, পাকিস্তান, ফিলিপাইন,জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে প্রতিদিনই বাংলা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়ে থাকে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সেদিন খুব দুরে নয়, যেদিন বাংলা একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ভাষার রূপ পাবে। তাই এ ভাষার মর্যাদা আরো উচ্চকিত করতে হলে আমাদের সবাইকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনে সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার করতে হবে। আর তাহলেই ৫২-র ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
আমরা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবো এবং অন্তত একজন নিরক্ষর লোককে বাংলা ভাষার অক্ষর জ্ঞান দান করবো – এই হোক এবারের মাতৃভাষা দিবসের শপথ হোক ।
নামঃ মোঃ আলমগীর হোসেন
ওশানোগ্রাফি এন্ড হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়

যে মানুষটির শরীরে পোষাক নাই তার স্বাভাবিক চিন্তা হবে পোষাক কেনার সামর্থ্য অর্জন করা,যে মানুষটির খাবার নাই তার প্রথম লক্ষ্য হবে খাবারের সংস্থান করা। অর্থনীতির ভাষায় যাকে আমরা বলতে পারি সীমিত সম্পদের মধ্য থেকে অসীম চাহিদার অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা গুলো মিটানো। যে সুতি কাপড় সামর্থ্য অজন করেনি এবং চেষ্টাও করেনা তার জামদানির চিন্তা করা বা যে একবেলা খেতে পারেনা তার তিন বেলা বিরিয়ানির স্বপ্ন শুধুই স্বপ্নই হতে পারে সম্ভাবনা হতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে আমাদের নানা কথা থাকতে পারে তবে সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
১৮ বছর বয়সের শক্তি,সাহস এবং সম্ভাবনা নিয়ে কারোই কোন সন্দেহ নাই।আর তাই কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সহ সকল সচেতন মহল এই সময়কে কাজে লাগানোর প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন একই সাথে গ্রন্থগত বিদ্যা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাবহারিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরীর দাবী সকলের। কিন্তু জাতির সবচেয়ে ক্ষতির বিষয় হচ্ছে এই ১৮ বয়সের মূল্যবান সময়কে কাজে না লাগিয়ে, না লাগার পরিবেশ তৈরী করে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক কাঠামো সহ সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলছি।বাংলাদেশে বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর স্বাভাবিক বয়স তুলনা করলে ১৮ বয়সের সামান্য আগে বা পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয় কিন্তু এই সম্ভাবনাময় সময়কে বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের শক্তিতে পরিণত করতে পারছেনা যার নেতিবচক প্রভাব পরিবার,সমাজ রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে দেখতে পাই। সকল শিক্ষার্থীর মেধা,সৃজনশীলতা ও আগ্রহ থাকা স্বত্তেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৮০% শিক্ষার্থী কোন না কোন ভাবে ঝরে পড়ে।একটি হিসাবের দিকে তাকালে বিষয়টির ভয়ংকর সত্যতা ফুটে উঠবে ।
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থীর উপর অনুসন্ধান চালালে দেখা যায় ৬০% শিক্ষার্থী পরীক্ষার পূর্ব ব্যাতিত সিলেবাস বা সিলেবাসের বাইরে তেমন কোন পড়াশুনাই করে না ।এরা অনেক বেশী বিনোদনমুখী এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সময়কে নষ্ট করে।
২. ১০% ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার্থী পরীক্ষার ১ বা ২ মাস আগে থেকে সিলেবাসের পড়াশুনা করে।এবং সারা বছরের বাকী সময় গুলো কাজে লাগার মত তেমন কিছুই করেনা।
৩. ১৫% ছাত্র-ছাত্রী ২ বা ৩ মাস আগে থেকে সিলেবাসের উপর পড়াশুনা করে।যদিও এক্ষেত্রে শুধু তাদের ফলাফল ভালো করার ইচ্ছাই প্রধান।
৪. আর বাকী ১৫% ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সারা বছর স্যারদের কাছে ভালো হবার জন্য, ভালো ফলাফল করার জন্য বা শিক্ষক হবার করার জন্য সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশুনা করে।
৫. প্রত্যেক গ্রুপে ০-৮ ভাগ ব্যতিক্রম আছে যারা সিলেবাসের পড়াশুনার সাথে বাইরের সৃজনশীল কাজে নিজেকে জড়িত রাখে, সৃজনশীল চিন্তা এবং কাজ করার চেষ্টা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃিষ্ট, বিতরন এবং সমাজের কাজে লাগানোর কথা থাকলেও আমাদের জ্ঞান তৈরী করাও হয়না আবার কাজের মূল্যবোধও তৈরী করা হয়না যার ফলে সমাজে সম্ভাবনাগুলো কমে আসছে।যে বয়সে আমাদের উদ্যোমী আর পরিশ্রমী হবার কথা সে সময়টা আমরা বিশেষ কোন কাজেই লাগাতে পারছিনা।আমরা যতেষ্ট আগ্রহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করি এবং যতেষ্ট হতাশা নিয়ে বের হই। সম¥ান পর্যায়ের শিক্ষার্থীগন সমাজের সবচেয়ে বেশী কাজে লাগতে পারে কিন্তু সেই শক্তি কাজে না লাগানোর ফলে আমাদের সমাজে সম্ভবনাময় খাত নষ্ট হচ্ছে নষ্ট হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ।বাজেট সহজ ও গভীর বিশ্লেষণে একটি বিনিয়োগ। একটি বাজেটে উৎপাদনশীল সম্ভাবনয় খাত গুলোতে জোর দিতে হবে এবং তার দীর্ঘমেয়াদী মুনাফা বা সেবা যেন সাধারণে পায় তার ব্যাবস্থা থাকতে হবে আর একটি বাজেটকে যুগোপযুগি সম্ভাবনাময় করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানোর কোন বিকল্প নেই। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতে কিছু বিশেষ পরিবর্তন অবশ্যই আনতে হবে এবং হবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ব্যাবস্থা গুলো পরিবর্তন হলে জাতির ইতিবাচক পরবির্তন হবে সে সমন্ধে আমার কিছু সুপারিশ আছে।
ক্স সুপারিশ ১: বাস্তব অবস্থায় এটা মানতেই হবে আমরা জীবনের সম্ভাবনাময় সময়গুলো প্রয়োজনের চাইতে অপ্রয়োজনেই বেশী ব্যায় করি আর তাই এ সময়কে কাজে লাগানোর জন্য সবার জন্য বাধ্যতামূলক ৩-৪ মাস শ্রমের ব্যাবস্থা করতে হবে বিষয় ভিত্তিক কাজ থাকলে সেগুলো তা না থাকলে যে কোন কাজে।
ক্স সুপারিশ ২: বিশ্ববিদ্যালয়কে ইংরেজি মাধ্যমে করার চেষ্টা না করে সম্পূর্ণ বাংলায় করতে হবে।ইংরেজি সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় কিছু দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরী করতে হবে যাতে করে তারা সকল দরকারী বই গুলো সহজ অনুবাদ করে আমাদের সরবরাহ করতে পারে।
ক্স সুপারিশ ৩: বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে তাদের অধিকার নিশ্চিতে প্রতি ৪ বা ৬ মাসে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে প্রশাসনকে দ্বায়বদ্ধ রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে।
ক্স সুপারিশ ৪: শিক্ষকদেরও রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র এবং ফলাফল তৈরীতে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বন্ধ করতে হবে।এতে করে শিক্ষক নিয়োগের বা শিক্ষাদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ক্স সুপারিশ ৫: শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত চিন্তার ও প্রতিভার বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নির্ধারণ করাতে হবে।
একদিনে বাংলাদেশের সব কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয় কিন্তু সম্ভাবনাময় এই বয়সের শক্তি এবং সাহস কাজে লাগিয়ে আমরা খুব দ্রæত আমাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কাঠামোতে এই স্বল্প মেয়াদী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো খুব দ্রæত নিশ্চিত করবে সমাজের দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন।

নূরূন্নবী ইসলাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া